ভারতের কাছে হিমালয় এত দিন মূলত ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব দৃশ্য, দেশের উত্তর সীমান্তের প্রহরী এবং অসংখ্য নদীর উৎস। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের দ্রুত অবনতির এই সময়ে হিমালয়কে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয়ে দেখতে হবে— দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে। কারণ হিমালয়ের ক্ষতি শুধু পাহাড়ি কয়েকটি রাজ্যের সমস্যা নয়, তার প্রভাব পড়তে পারে গোটা দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে।
হিমালয়ের হিমবাহগুলি দ্রুত গলছে। এর অর্থ এই নয় যে আগামীকাল থেকেই সব নদী শুকিয়ে যাবে। বরং বিপদটি এখন অন্যভাবে দেখা দিচ্ছে। হিমবাহ গলে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে, পাহাড়ের ঢাল অস্থির হয়ে পড়ছে এবং হঠাৎ বন্যা বা ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে। ভবিষ্যতে হিমবাহের বরফের ভাণ্ডার কমে গেলে নদীগুলির জলপ্রবাহ আরও বেশি নির্ভর করবে অনিয়মিত বৃষ্টি ও তুষারপাতের উপর। ফলে জলনিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
এই সমস্যার অর্থনৈতিক দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয় থেকে নেমে আসা জল ভারতের কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটন এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বিস্তীর্ণ কৃষি অঞ্চল এই জলব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিরও প্রধান ভিত্তি নদী। তীর্থযাত্রা ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পাহাড়ের স্থিতিশীলতার উপর নির্ভরশীল। অতএব হিমালয়ের পরিবেশগত বিপর্যয় শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দাম, বিদ্যুতের খরচ, পরিকাঠামোর ক্ষতি এবং সরকারের বাড়তি আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা মিলেছে। উত্তরাখণ্ডের ২০২১ সালের বিপর্যয় কিংবা সিকিমে ২০২৩ সালের হঠাৎ হিমবাহ-হ্রদের জল নেমে আসার ঘটনা দেখিয়েছে, পাহাড়ের একটি স্থানীয় বিপর্যয় কত দ্রুত সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর বড় আঘাত হানতে পারে। সংকীর্ণ উপত্যকায় রাস্তা, বসতি ও নানা প্রকল্পের ঘনত্ব বিপদের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
সমস্যা হল, হিমালয়কে এখনও নানা দফতরের আলাদা আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কোথাও পরিবেশ, কোথাও পর্যটন, কোথাও সড়ক, কোথাও জলবিদ্যুৎ, কোথাও আবার দুর্যোগ মোকাবিলা। কিন্তু প্রকৃতি এই প্রশাসনিক সীমারেখা মানে না। একটি বাঁধ, রাস্তা বা পাহাড় কেটে নির্মাণের প্রভাব বহু দূরের জনপদেও পৌঁছতে পারে।
তাই হিমালয় সম্পর্কে সমন্বিত নীতি জরুরি। উপগ্রহ-নির্ভর নজরদারি, ভূমিধস ও হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ, উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য জলসংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এগুলিকে নিছক গবেষণার খরচ হিসেবে দেখলে চলবে না; এগুলি জাতীয় পরিকাঠামোরই অংশ।
আরও একটি বিষয় গুরুত্ব পাওয়া দরকার— ব্ল্যাক কার্বন বা কালো ধোঁয়া। সমতল অঞ্চলের নানা দূষণকারী উৎস থেকে নির্গত এই কণাগুলি হিমবাহের উপর জমে বরফ গলার গতি বাড়াতে পারে। দূষণ কমানো জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান নয়, কিন্তু হিমালয় রক্ষায় এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে আঞ্চলিক উদ্যোগের তুলনামূলক দ্রুত ফল মিলতে পারে।
হিমালয় রক্ষার ব্যয় অবশ্যই আছে। কিন্তু বিপর্যয়ের পরে ক্ষতিপূরণ, পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ব্যয় অনেক বেশি হতে পারে। তাই উন্নয়ন বন্ধ করা নয়, উন্নয়নের পদ্ধতি বদলানোই এখন মূল কথা। হিমালয়কে শুধু সীমান্ত বা পর্যটনের ভূদৃশ্য হিসেবে নয়, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। আজ সচেতন বিনিয়োগই আগামী দিনের অনিশ্চিত বিপর্যয়ের খরচ কমাতে পারে।




