সংবাদমাধ্যম কি সত্যিই বিশৃঙ্খল অবস্থা বা সংকটের মধ্যে পড়েছে? প্রশ্নটি শুনতে যতটা সরল, উত্তরটি ততটাই জটিল। কারণ সংবাদমাধ্যমের বর্তমান সংকটকে কোনও একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাজনীতি, বিজ্ঞাপন, পাঠকের পরিবর্তিত রুচি এবং সর্বোপরি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন— সবকিছু মিলিয়েই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সংকট মানেই যে শেষের শুরু, তা নয়। বরং সঠিক আত্মসমালোচনা ও পরিবর্তনের ইচ্ছা থাকলে এই সময়টিই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি দ্য স্টেটসম্যান আয়োজিত ‘Media is only responsible for the mess it is in’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন কয়েকজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক। সহজ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়— ‘সংবাদমাধ্যম আজ যে সংকটে পড়েছে, তার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী’।
আলোচনাটি পরিচালনা করেন দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদক রবীন্দ্র কুমার। অংশ নেন ‘আউটলুক’-এর প্রাক্তন এডিটর-ইন-চিফ কৃষ্ণ প্রসাদ, ‘দ্য ওয়্যার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভাটিয়া, ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রাক্তন সম্পাদক আর রাজাগোপাল এবং ‘দ্য হিন্দু’-র প্রাক্তন সম্পাদক মুকুন্দ পদ্মনাভন। তাঁদের বক্তব্যে মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁরা কার্যত একমত— সংবাদমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়ের মধ্যে
দিয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্র কুমারের সূচনাপর্বের প্রশ্নটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ— সংবাদমাধ্যমের এই ‘মেস’ আসলে কীসের? রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, বিজ্ঞাপনের, প্রাসঙ্গিকতার, নাকি বিশ্বাসযোগ্যতার? সম্ভবত প্রত্যেকটিরই কিছুটা। এবং একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্কও গভীর।
কৃষ্ণ প্রসাদ মনে করেন, সাংবাদিকতা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে সংবাদমাধ্যমকে আর সবসময় মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সিদ্ধার্থ ভাটিয়ার বক্তব্যেও উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তাঁর মতে, সংবাদপত্রের কাজ দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা এবং যাঁদের কণ্ঠস্বর দুর্বল, তাঁদের কথা সামনে নিয়ে আসা। এই দায়িত্ব পালনে সংবাদমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে।
এই সমালোচনার মধ্যে আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের মূল শক্তি তার প্রযুক্তি নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি খবর কত দ্রুত প্রকাশিত হল, কত লক্ষ মানুষ দেখল বা কতবার শেয়ার হল— এসব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু শেষ বিচারে সংবাদমাধ্যমের মূল্য নির্ধারিত হয় তথ্যের সত্যতা, অনুসন্ধানের গভীরতা এবং মানুষের আস্থার উপর।
এই জায়গাতেই ডিজিটাল প্রযুক্তি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষের মনোযোগ এখন অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। অ্যালগরিদম সেই বিষয়গুলিকেই সামনে আনতে পারে, যেগুলি দ্রুত বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে উত্তেজক, বিতর্কিত, বিদ্বেষপূর্ণ বা বিভাজনমূলক বিষয় অনেক সময় গভীর ও তথ্যনির্ভর প্রতিবেদনের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সংবাদ যদি শুধুই ‘ক্লিক’-এর হিসাব অনুসরণ করতে শুরু করে, তাহলে সাংবাদিকতার সামাজিক ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিন্তু সমস্যাটির অন্য একটি দিকও রয়েছে, তা হলো অর্থনীতি। মুকুন্দ পদ্মনাভন যথার্থই সংবাদমাধ্যমের আর্থিক শক্তির প্রশ্নটি সামনে এনেছেন। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে সময় লাগে, দূরবর্তী অঞ্চলে সাংবাদিক পাঠাতে অর্থ লাগে, তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করতে পরিকাঠামো লাগে। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসব কাজ দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
অতএব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়েও আলোচনা করতে হবে। বিজ্ঞাপন-নির্ভরতা, পাঠকের সংখ্যা, সাবস্ক্রিপশন, ডিজিটাল আয়— সবকিছুর মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করা জরুরি। সংবাদপাঠকও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভালো সাংবাদিকতার জন্য যদি পাঠক অর্থ দিতে অনিচ্ছুক হন, অথচ বিনামূল্যে দ্রুত সংবাদ প্রত্যাশা করেন, তাহলে মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে
পড়তে পারে।
আর রাজাগোপাল ভারতীয় সাংবাদিকতার পরিবর্তনের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, তার আগে সাংবাদিকতার একটি উল্লেখযোগ্য সময় ছিল, পরে বিনোদন ও বলিউডের খবরের প্রসার এবং রাজনৈতিক সংবাদকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ অবশ্য একটি নির্দিষ্ট সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের ইতিবাচক দিকটি গুরুত্বপূর্ণ— তিনি নতুন সংবাদমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিকদের মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন।
এই সম্ভাবনাটিই সম্ভবত আজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। সিদ্ধার্থ ভাটিয়া ছোট ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম স্বাধীন প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ডিজিটাল মাধ্যমের সুবিধা হল, বড় পরিকাঠামো ছাড়াই একটি ছোট দল গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতা করতে পারে। কিন্তু সেখানেও একই প্রশ্ন— তারা আর্থিকভাবে কতদিন টিকে থাকবে?
সম্ভবত ভবিষ্যতের সংবাদমাধ্যমকে পুরনো ও নতুনের মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নিতে হবে না। বরং দুয়ের শক্তিকে একত্র করতে হবে। ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্রগুলির রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সংবাদ সংগ্রহের পরিকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকতার সংস্কৃতি। নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের রয়েছে গতি, নমনীয়তা এবং নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছনোর ক্ষমতা। এই দুই ধারার মধ্যে সুস্থ সহযোগিতা তৈরি হলে সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী
হতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হল মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া। শহরের আলোচিত বিষয়ের পাশাপাশি গ্রাম, মফস্বল, সীমান্ত, কৃষি, শ্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খবরকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন সমাজের নীরব অংশগুলিও তার মধ্যে নিজেদের উপস্থিতি খুঁজে পায়।
সংবাদমাধ্যমকে তাই শুধু প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিলে চলবে না, তাকে নিজের নৈতিক ভিত্তিও শক্ত করতে হবে। তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, সূত্রের স্বচ্ছতা, ভুল হলে সংশোধন এবং ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার সাহস— এসব কোনও পুরনো আদর্শ নয়, বরং ভবিষ্যতের সাংবাদিকতারও অপরিহার্য শর্ত।
আজকের ‘মেস’ থেকে বেরিয়ে আসার পথ তাই শুধু সংবাদমাধ্যমের হাতে নেই। সাংবাদিক, সংবাদপ্রতিষ্ঠান, পাঠক, দর্শক এবং বৃহত্তর সমাজ— সব পক্ষেরই ভূমিকা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমকে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে, আর পাঠককে ভালো সাংবাদিকতার মূল্য বুঝতে হবে।




