• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 27 August, 2026

সেন্ট মার্টিন: ছোট্ট দ্বীপ ঘিরে বড় শক্তির হিসাব

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের বুকে সেন্ট মার্টিন। আয়তনে ছোট্ট এই দ্বীপটি দেখতে যতটা শান্ত, তার ভূরাজনৈতিক অবস্থান ততটাই

সেন্ট মার্টিন: ছোট্ট দ্বীপ ঘিরে বড় শক্তির হিসাব

PIC-X

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের বুকে সেন্ট মার্টিন। আয়তনে ছোট্ট এই দ্বীপটি দেখতে যতটা শান্ত, তার ভূরাজনৈতিক অবস্থান ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। মায়ানমারের রাখাইন উপকূল ও নাফ নদীর মোহনার কাছে অবস্থিত হওয়ায় সেন্ট মার্টিন যেন বঙ্গোপসাগরের এক সংবেদনশীল জানালা। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত স্বার্থ এখানে এসে মিলেছে। ফলে পর্যটনের জন্য পরিচিত এই দ্বীপটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনাতেও বারবার উঠে আসছে।
সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় এমন অভিযোগ উঠেছিল যে, আমেরিকা নাকি দ্বীপটিতে সামরিক সুবিধা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও এমন কথাবার্তা শোনা যায় যে, আমেরিকাকে সেন্ট মার্টিনের বিষয়ে সুবিধা দিলে তাঁর সরকার হয়তো টিকে যেতে পারত। কিন্তু এই দাবির পক্ষে প্রকাশ্য কোনও নির্ণায়ক প্রমাণ সামনে আসেনি। মার্কিন প্রশাসনও জানিয়েছে, সেন্ট মার্টিন দখল বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তাদের কোনও আলোচনা হয়নি। ফলে এই বিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও তথ্যের বিচারে সতর্ক থাকা জরুরি।
তবে আমেরিকার বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের দিকে তাকালে সেন্ট মার্টিনের অবস্থানকে একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। চিনের ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তি, ভারত মহাসাগরে তার উপস্থিতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বৃদ্ধির দিকে নজর রাখছে ওয়াশিংটন। বঙ্গোপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নজরদারি ও যোগাযোগের সক্ষমতা তাই যে কোনও বড় শক্তির কাছেই কৌশলগত সম্পদ। এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে, সেন্ট মার্টিনে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
চিনের হিসাব আরও দীর্ঘমেয়াদি। চিনের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য মালাক্কা প্রণালী হয়ে আসে। কোনও আন্তর্জাতিক সংঘাতের সময় এই জলপথ বাধাগ্রস্ত হলে চিনের অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সেই কারণেই বেইজিং বহুদিন ধরে ভারত মহাসাগরে বিকল্প যোগাযোগপথ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। মায়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের কিয়াউকফিউ বন্দর এবং সেখান থেকে চিন পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন সেই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মায়ানমার তাই চিনের কাছে শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি বিকল্প দরজাও।
সেন্ট মার্টিনের কাছেই মায়ানমারের রাখাইন উপকূল। অথচ রাখাইন আজ গভীর সংঘাতের মধ্যে। মায়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির সংঘর্ষ গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে সেন্ট মার্টিনের আশপাশে কোনও বিদেশি শক্তির সামরিক বা গোয়েন্দা উপস্থিতি বাড়লে মিয়ানমারের উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। সীমান্তের সঙ্গে তখন যুক্ত হবে সমুদ্র নিরাপত্তা, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং শরণার্থী সমস্যার মতো নতুন মাত্রা।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল। চিনের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা তার দরকার। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। আবার বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির সঙ্গে আমেরিকা ও পশ্চিমি বাজারের সম্পর্ক গভীর। ফলে কোনও একটি শক্তির দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়া ঢাকার পক্ষে সহজ নয়। সেন্ট মার্টিনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাই নিজের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে ভারসাম্যের কূটনীতি বজায় রাখা।
ভারতের দৃষ্টিতেও সেন্ট মার্টিনের গুরুত্ব কম নয়। বঙ্গোপসাগর ভারতের পূর্ব উপকূলের নিরাপত্তা, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং মালাক্কা প্রণালীর সঙ্গে যুক্ত। বঙ্গোপসাগরে চিনের সামুদ্রিক উপস্থিতি বাড়লে ভারতের নিরাপত্তা-সমীকরণও বদলাবে। তবে প্রতিটি চিনা বন্দরকে সম্ভাব্য সামরিক ঘাঁটি হিসেবে দেখা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনই বাণিজ্যিক পরিকাঠামোর ভবিষ্যৎ কৌশলগত ব্যবহারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আবার আমেরিকার অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতিও ভারতের কাছে স্বস্তির বিষয় হবে না। ভারত ও আমেরিকা ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হলেও দিল্লি নিজের নিকটবর্তী সমুদ্রভূমিতে কোনও মহাশক্তির স্থায়ী সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চায় না। কারণ আমেরিকা ও চিনের সরাসরি সংঘাতের ক্ষেত্র যদি বঙ্গোপসাগরের দিকে সরে আসে, তার অভিঘাত ভারতের ওপরও পড়বে।
ভারতের আরও বড় স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক আস্থা বজায় রাখা। দুই দেশের সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে, ভারত তার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছে, তাহলে সেই অসন্তোষকে কাজে লাগানোর সুযোগ অন্য শক্তির হাতে চলে যেতে পারে। তাই সেন্ট মার্টিনের প্রশ্নে ভারতের জন্য সামরিক সতর্কতার পাশাপাশি কূটনৈতিক আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনের আসল গুরুত্ব দ্বীপটির অবস্থানগত পরিচয়ে। সমুদ্রের বুকে ছোট্ট এই দ্বীপটি এমন এক অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভারত, চিন, আমেরিকা ও মায়ানমারের স্বার্থ একে অপরকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। তাই তাকে মহাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার দাবার ঘুঁটি করে তোলার পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখা দরকার। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভারতের নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরের শান্তি— এই তিনটি স্বার্থকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ।