বিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ঘটনাকে বলা হয় ক্লাউড বার্স্ট। এটা আবার এক ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্ষয়ও বলা যেতে পারে৷ এর চরিত্রও আবার আলাদা। অল্প সময়ের মধ্যে শুরু হতে পারে তুমুল বৃষ্টি। সঙ্গে হতে পারে শিলা কিংবা বজ্রপাতও৷ অনেক সময় সেটা আবার ঠিকভাবে টের পাওয়াও যায় না। বিশেষ করে রাতের দিকে হলে তো কথাই নেই।
সম্প্রতিকালে কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনা তো প্রমাণ করে দিল সেটাই। আকাশে মেঘ নেই, নেই তার ঝলকানি কিংবা গর্জনও। নেই ঝড়ঝঞ্ঝা বা আগাম বৃষ্টির সংকেতও৷ কিন্তু তবুও ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেল সেটাই। আর তাতে সকলে অবাক৷ কারণ, সমতল ভূমিতে এই ধরনের ঘটনা ঘটার কথাই নয়। সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় অথবা বেশ উচ্চতা যুক্ত কোনস্থানেই ঘটে থাকে এই ধরনের ঘটনা। সাধারণত পাহাড় পর্বত যুক্ত স্থানেই ঘটে এহেন ঘটনা। কারণ সেখানকার বাতাস খুব দ্রুত বেগে উপরের দিকে উঠে যেতে পারে এবং তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডাও হয়ে ওঠে। তারপর তারা ঘণীভূত হয় এবং বড়-বড় ফোঁটায় পরিণত হয় এবং দ্রুত গতিতে নিচের দিকে নেমেও আসে।
বিজ্ঞান বলছে এই ধরনের ঘটনা ঘটার আবার আছে অন্য অনেক কারণও৷ যদি নিচের গরম বাতাস কোনও কারণে উপরের দিকে উঠে যায় তখন তা অতি নিশ্চিন্তেই মিশে যেতে পারে সেই স্থানের ঠাণ্ডা বাতাসেরই সঙ্গে। আর তারপর তারা মিলেমিশে একাকার হয়েই ঘটিয়ে ফেলতে পারে নানান রকমের অঘটনও৷ সেটা তখন রূপান্তরিত হতে পারে মেঘ এবং অবশেষে প্রবল ধারায় বৃষ্টিও৷
বিজ্ঞান বলছে, বৃষ্টিপাতের হার যদি ঘন্টায় একশো মিলিমিটার অথবা কমবেশি কিছু হয় তাহলে তাকে মেঘভাঙা বৃষ্টি বা ক্লাউড বার্স্ট, এই নামেই অভিহিত করা হয়ে থাকে। আর সেই ধরনের বৃষ্টির স্রষ্টা যেসমস্ত মেঘ তারা মাটি থেকে মোটামুটি
১৫ কিলোমিটার উচুঁতেও উঠতে পারে অতি সহজেই। আর পৃথিবীর বুকে হরেক রকমের ক্ষতি করার অসীম ক্ষমতার অধিকারী তারা। কারণ সেই ধরনের মেঘমালা থেকে সৃষ্ট বৃষ্টিধারা বিনা নোটিশে নিচে নেমে আসে বলেই ধরিত্রীর মৃত্তিকা তাদের শোষণ করার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলে। আবার নিচের নদী-নালাও পারে না তাদের ঠিকভাবে ধারণ করতে কিংবা সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে।
বলাই বাহুল্য, কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বুকে ঘটে যাওয়া সেইসময় সেই ধরনের বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছিল এই কারণে যে, বর্ষা বিদায়ের ঠিক প্রাক মুহূর্তেই ঘটেছিল সেই ধরনের ঘটনা তাই৷ আর অতি অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনায় আমরা আঙুল তুলছি প্রশাসনেরই দিকে। কিন্তু সেটার কি সত্যিই কোন প্রয়োজন ছিল? কেউ কি ইচ্ছে করে ডেকে আনতে পারে অতি ভয়াবহ সেই বিপর্যয়? সুতরাং অযথা দোষারোপ নয়৷ এই মুহূর্তে আমাদের ভাবতে হবে অনেক কিছুই৷ সেই দুর্যোগ মোকাবেলায় সবাই একজোট হয়েই নেমে পড়তে হবে শুধুমাত্র নিজেদের সুরক্ষারই তাগিদে।
এতো হল ক্লাউড বার্স্টের কথা৷ মেঘ এবং বৃষ্টি নিয়ে আছে আরও অনেক কথা। রাজধানী দিল্লি মেঘ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে অন্য কথা। আর আজ দিল্লি যেকথা ভাবছে আগামী দিনে হয়তো একই কথা ভাববে কলকাতা, মুম্বাই অথবা অন্যান্য শহরও৷ কিন্তু কেন এমন ভাবনা? জানা গেল, এই মুহূর্তে দিল্লির বায়ু দূষণের মাত্রা নাকি বেড়ে গেছে অনেকটাই৷ অতএব খুঁজতে হবে সমস্যা সমাধানের সঠিক উপায়ও৷ অবশেষে দিল্লির প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে হ্রাস করা হবে দুষণের পরিমাণও। আইআইটি কানপুরের সহযোগিতায় দিল্লির পরিবেশ বিভাগের তরফ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই কৃত্রিম বৃষ্টিপাত অর্থাৎ ক্লাউড সিডিংয়ের এবং সেটা খুব শীঘ্রই বাস্তবায়িত করাও হবে।
ক্লাউড সিডিং হল আবহাওয়া পরিবর্তনের একটা কৌশল মাত্র। কৃত্রিম প্রক্রিয়াও বলা যেতে পারে। তাতে মেঘের মধ্যে মিশ্রিত অবস্থায় থাকবে সিলভার আয়োডাইট, পটাশিয়াম, আয়োডাইট ইত্যাদি। সেগুলো কাজ করবে নিউক্লিয়াস হিসেবে আদ্রতাকে ঘণীভূত করে জলের কণাগুলোকে বৃহত্তর ফোঁটায় পরিণত করবে। তারপর নেমে আসবে নিচে তার নির্দিষ্ট বৃত্তেরই মাঝখানে।
কিন্তু কথা হল তাতে কি সব সমস্যার সমাধান হবে? হলেও তারপর নতুন কোন সমস্যা বড় ধরনের কোনও বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে না তো? এই ধরনের ভাবনার সঙ্গত অনেক কারণও অবশ্য আছে। কারণ সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুকে ঘটে যাওয়া ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তার সত্যাসত্যও। এই তো কয়েক মাস আগেরই কথা, তখন বানভাসি হয়ে উঠেছিল সেখানকার বিস্তীর্ণ এলাকা৷ তখন পৃথিবীর ব্যস্ততম বিমানবন্দর দুবাইয়ের অবস্থা হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর৷ পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশ-বিদেশের সমস্ত বিমান ওঠা বা নামার কাজ৷ ফলে সেখানে আটকে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন অসংখ্য যাত্রী৷ আর সেইসময় ভীষণ অসহায় বোধ করেছিলেন তাঁরা৷ বেড়ে গিয়েছিল তাঁদের মনের চাপও। আর সেইসময় কয়েক দিন ধরে চলা অকাল বর্ষণের ফলে সেই অঞ্চল-সহ পার্শ্ববর্তী আরও অনেক এলাকার করুণ অবস্থাটাও ভাবিয়ে তুলেছিল সকলকেই।
পশ্চিম এশিয়ার দেশ আরব আমিরাতে কয়েকদিন ধরে চলা অবিরাম বৃষ্টি ধারায় তখন বিপর্যস্ত ছিলেন সকলেই৷ পৃথিবীর মানচিত্রে মরুদেশ হিসেবেই পরিচিত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল৷ বৃষ্টিপাত সেখানে প্রায় হয় না বললেই চলে৷ তাই সেখানে নেই কোনও ঋতু এবং নেই তাদের পরিবর্তনও৷ আর সেইসব বিষয় নিয়ে কেউ কখনও মাথা ঘামাবার তেমন একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না৷ কিন্তু হঠাৎ-হঠাৎই ঘটে যাওয়া সেই বৃষ্টিধারা ভাবিয়ে তুলেছিল সকলকেই৷ সকলের মনে সৃষ্টি হয়েছিল নানান কৌতুহলের৷ কারণ বিগত সত্তর বছর সেখানে এই ধরনের বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটেনি৷ প্রধান শহর দুবাই এর অবস্থাও একেবারে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল৷ ডুবে গিয়েছিল ছোট বড় সমস্ত রাস্তাঘাট, অলি-গলি, হাটবাজার, শপিংমল-সহ বিমানবন্দর৷ বন্ধ ছিল সমস্ত স্কুল কলেজ এবং অফিস আদালত৷ ভয়ের চোটে মানুষ তো রাস্তায় বের হতেও ভয় পাচ্ছিলেন সেইসময় জলের ধাক্কায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল পুরো শহরই৷ পাশাপাশি অন্যান্য আরও অনেক জায়গার অবস্থা হয়ে উঠেছিল আরও শোচনীয়৷ বন্ধ ছিল সব ধরনের কাজই৷ যেখানে দু-চোখ যায় সেখানেই দেখা গিয়েছিল জলের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার গাড়ি । গগনচুম্বী বাড়িগুলোর সামনেও শুধুই জলের স্রোত৷ তখন বৃষ্টির দাপট যত বাড়ছিল পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল নানান ধরনের শঙ্কা৷ অতএব সেই দৃশ্য দেখে শঙ্কিত ছিলেন সকলেই এবং তারপর কী করণীয় সেটা নিয়েও ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিলেন সকলে৷
আমিরাতের এহেন ঘটনায় অবাক হওয়ার অনেক কারণও অবশ্য আছে। এই ধরনের বৃষ্টিপাতের ঘটনাকে সেখানকার মানুষজন বড় ধরনের একটা অঘটন ছাড়া অন্য আর কিছু ভাবতেই পারছেন না। বিস্তৃত সেই মরু প্রান্তর৷ উষ্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে তীব্র দাবদাহের মিশ্রণই হল সেই এলাকার অতি প্রত্যাশিত অনুভূতিও৷ আর তারই মাঝে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত সেই অঞ্চলের মানুষজনের মনে একটু শান্তির পরশ এনে দিলেও তা যে ক্ষণস্থায়ী, সেটাও বোঝেন সকলেই৷ তাই হঠাৎ হঠাৎই তীব্র বৃষ্টিপাতের সেই ঘটনায় সকলে একটু অবাকও হয়েছিলেন।
এখন সকলের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই ক্লাউড সিডিং ব্যাপারটা আসলে কী। ঘটনা হল এটা কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের একটা আধুনিক পদ্ধতি মাত্র। সেটা অতি অবশ্যই বিজ্ঞানসম্মতও৷ আর সম্প্রতিকালে দুবাই এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় এই পদ্ধতিতেই বেশ কয়েক বছর ধরে ঘটে চলেছিল বৃষ্টিপাতের ঘটনাও তাতে মিলছিল উল্লেখযোগ্য ফলাফলও৷ তখন সেটা আবার সকলের কাছে ভীষণ গ্রহণযোগ্য হয়েও উঠেছিল৷
সেই এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ভীষণ কম হওয়ার কারণে ছিল না জল নিষ্কাশনের কোনও পাকাপোক্ত ব্যবস্থাও৷ আর সেটার প্রয়োজনীয়তার কথাও তখন কারও মাথায় আসেনি৷ পরে শহরের কেন্দ্রস্থলে সেই ব্যবস্থা করা হলেও বাইরে কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটা হয়নি৷ তাই অপ্রত্যাশিত এই বর্ষণে জমে যাওয়া জল বাইরে বের করাটা তখন যে একটু সমস্যাবহুলই হয়ে উঠেছিল সেটাই স্পষ্টভাব বুঝেছিলেন সকলে। এখন এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর কখনও না ঘটে সেই ভাবনাও তাঁদেরই৷




