নেপালের বন্যা-ঝুঁকি আসলে একটি অভিন্ন হিমালয়-ব্যবস্থার অংশ।
নেপালে ছোট-বড় হাজার হাজার নদী ও জলধারা রয়েছে। তাদের অধিকাংশই দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ভারতের সমভূমিতে প্রবেশ করেছে। কোসি, গণ্ডক, ঘাঘরা, বাগমতী, কমলা, রাপ্তি প্রভৃতি নদী বিহার, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এর মধ্যে বিহারের ক্ষেত্রে বিপদের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। উত্তর বিহারের বিরাট অংশ বন্যাপ্রবণ এবং বহু নদীর উৎস নেপালের পাহাড়ি এলাকায়। কোসি নদী তো দীর্ঘদিন ধরেই ‘বিহারের দুঃখ’ নামে পরিচিত।
কিন্তু বন্যার জল সীমান্ত পেরিয়ে এলেই যে তা ভয়াবহ বিপর্যয়ে পরিণত হবে, এমন নয়। বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। নেপালে কতটা বৃষ্টি হয়েছে, কোথায় হয়েছে, নদীতে সেই জল কত দ্রুত নেমে এসেছে— এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশের পরে নদীর সঙ্গে কী ঘটছে, তার উপরেও বিপর্যয়ের মাত্রা নির্ভর করে। ভারতের নিজস্ব বৃষ্টি, নদীর জলস্তর, বাঁধ ও বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যারাজ, নিকাশি ব্যবস্থা, নদীর গতিপথ এবং নদীর দু’পাশে অপরিকল্পিত বসতি— সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৮ সালের কোসি বিপর্যয় এই সত্যের একটি বড় শিক্ষা। সেই ঘটনায় বিহারে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু নদীতে অস্বাভাবিক পরিমাণ জল এসেছিল বলেই বিপর্যয় ঘটেছিল, এমন নয়। দুর্বল ও যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না-করা বাঁধ ভেঙে যাওয়াই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছিল। অর্থাৎ বন্যা কখনও শুধু প্রকৃতির তৈরি বিপদ নয়; মানুষের তৈরি অব্যবস্থা তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এখানেই ভারতের জন্য বড় শিক্ষা। নদীকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে বন্যা মোকাবিলা করা যায় না। বাঁধ নির্মাণ, নদীর পাড়ে বসতি, জলনিকাশি বন্ধ করে দেওয়া, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত করা—এসবের দীর্ঘমেয়াদি ফল বিপজ্জনক হতে পারে। একটি বাঁধ একসময় সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু তার রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল হলে সেটিই বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আবার নদীর পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেলে জলধারণের ক্ষমতাও কমে যায়।
আরও একটি ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন। নেপাল ইচ্ছা করে ভারতের দিকে বন্যার জল ‘ছেড়ে দেয়’— এই অভিযোগ বাস্তবতার অত্যন্ত সরলীকৃত ব্যাখ্যা। নেপালে ভারতের মতো বিপুল জলধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বড় জলাধার নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীমান্তে যে বিপুল জল পৌঁছয়, তা মূলত পাহাড়ি অঞ্চলে হওয়া বৃষ্টির ফল। ফলে বন্যার জন্য নেপালকে দায়ী করার বদলে দুই দেশেরই বোঝা উচিত, একই নদী-ব্যবস্থার দুই প্রান্তে তাদের অবস্থান।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কিছু করণীয় নেই। বরং করণীয় অনেক বেশি। নেপালে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে তার খবর যত দ্রুত সম্ভব ভারতের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পৌঁছতে হবে। কোথায় কত বৃষ্টি হচ্ছে, কোন নদীতে জল কত দ্রুত বাড়ছে, কোথায় বাঁধ দুর্বল, কোথায় নদীর গতিপথ বদলেছে— এই তথ্য নিয়মিত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে ভাগ করে নেওয়া দরকার। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বৃষ্টিপাত ও নদীর জলস্তর সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান হয়। কিন্তু পাহাড়ি ছোট নদী এবং দ্রুত বন্যা নামতে পারে এমন এলাকাগুলিতে নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি।
কারণ সময় খুব কম। সাধারণ বন্যার ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা থেকে এক-দু’দিনের পূর্বাভাসও বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু পাহাড়ি হড়পা বান, ভূমিধসের ফলে নদী আটকে গিয়ে হঠাৎ তা ভেঙে পড়া, কিংবা বরফ-পাথর-মাটির বিশাল স্রোত নেমে এলে সময় আরও কমে যায়। তখন শুধু নদীর জল মাপলেই হবে না; পাহাড়ের পরিবর্তনও নজরে রাখতে হবে।
এই জায়গাতেই বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের জন্য আরও বড় সতর্কবার্তা। হিমালয় বদলাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, হিমবাহের পরিবর্তন, হিমবাহ-হ্রদ থেকে আকস্মিক জলস্রোত, পাহাড়ি ঢাল ভেঙে পড়া— এই ধরনের বিপদের সম্ভাবনা বাড়ছে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টির বদলে অল্প সময়ে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। তার সঙ্গে পাহাড়ের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতি যুক্ত হলে তৈরি হচ্ছে এমন স্রোত, যা শুধু জল নয়— পাথর, কাদা, বালি, গাছ এবং বিপুল পরিমাণ পলি বয়ে নিয়ে আসে।
২০২১-এর চামোলি বিপর্যয় কিংবা ২০২৫-এর ধরালি বিপর্যয় ভারতের সামনে সেই বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। এই ধরনের দুর্যোগকে প্রচলিত বন্যার মাপকাঠিতে দেখলে ভুল হবে। জল যখন পাথর ও পলির সঙ্গে মিশে প্রবল গতিতে নেমে আসে, তখন তার ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি। সেতু, রাস্তা, ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র— কোনও কিছুই নিরাপদ থাকে না।
তাই নেপালের সাম্প্রতিক বন্যাকে ভারতের কাছে কেবল প্রতিবেশী দেশের দুর্যোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একই সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ বিপদের পূর্বাভাস। হিমালয় কোনও রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না, নদীও মানে না। পাহাড়ে যে পরিবর্তন শুরু হয়, তার প্রভাব সমভূমিতে পৌঁছতে বাধ্য।
ভারত ও নেপালের প্রয়োজন তাই আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা। যৌথ তথ্যভান্ডার, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, পাহাড়ি এলাকায় আরও নজরদারি, নদী ও পলি ব্যবস্থাপনা, বাঁধের নিয়মিত পরীক্ষা এবং সীমান্তের দুই পাশে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু সরকারি দপ্তরের মধ্যে তথ্য বিনিময় যথেষ্ট নয়, সেই সতর্কবার্তা শেষ পর্যন্ত নদীপাড়ের সাধারণ মানুষের কাছে
পৌঁছতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হল দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। বৃষ্টি কোনও দেশের সিদ্ধান্ত নয়। নদীর জলও কোনও দেশের সম্পত্তি নয়। ভারত ও নেপাল একই হিমালয়-নদী ব্যবস্থার অংশ। একজন upstream, অন্যজন downstream— এই ভৌগোলিক সত্যকে বিরোধের নয়, সহযোগিতার ভিত্তি করতে হবে।
নেপালের বন্যা তাই ভারতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা: সীমান্ত পাহারা দেওয়া যায়, কিন্তু নদীকে সীমান্তে থামানো যায় না। আগামী দিনের নিরাপত্তা নির্ভর করবে নদীকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা গেল তার উপর নয়, বরং নদীর স্বাভাবিক আচরণকে কতটা বুঝে, আগাম বিপদ চিনে এবং দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারল তার উপর।




