• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 4 September, 2026

ভারত-বেলজিয়াম সম্পর্ক

ভারত ও বেলজিয়ামের সম্পর্কের সঙ্গে এত দিন ‘হিরে’ শব্দটি যেন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল। বিশ্বের হিরে ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ

ভারত-বেলজিয়াম সম্পর্ক

PIC- AI

ভারত ও বেলজিয়ামের সম্পর্কের সঙ্গে এত দিন ‘হিরে’ শব্দটি যেন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল। বিশ্বের হিরে ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র অ্যান্টওয়ার্প এবং ভারতের সুরাত— এই দুই কেন্দ্রের যোগসূত্র দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট দে ভেভারের বৈঠক স্পষ্ট করে দিল, ভারত-বেলজিয়াম সম্পর্ক আর শুধু হিরের বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। দুই দেশ এখন সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত, কৌশলগত এবং ভবিষ্যৎমুখী করে তুলতে আগ্রহী।
হায়দরাবাদ হাউসে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে প্রতিরক্ষা, পরিচ্ছন্ন শক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সেমিকন্ডাক্টর, সামুদ্রিক বিষয়, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মতো একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী পাঁচ বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্যও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় বহন করে। এই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা অবশ্য নির্ভর করবে ঘোষণাগুলিকে কত দ্রুত এবং কার্যকর ভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় তার উপর।
বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রসার গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ, ‘জোরাওয়ার’ ট্যাঙ্ক নিয়ে কাজ এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ও বিনিময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বেলজিয়ামের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ভারতের উৎপাদনক্ষমতা ও বৃহৎ বাজার— এই দুইয়ের সমন্বয় হলে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা যেন কেবল অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা এবং যৌথ উৎপাদনের দিকে এগোয়, সেটিই হওয়া উচিত ভারতের প্রধান লক্ষ্য।
পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রেও সহযোগিতার সম্ভাবনা যথেষ্ট। শক্তির রূপান্তর এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তি— সব ক্ষেত্রেই লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের গুরুত্ব বাড়ছে। ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তির নিরাপত্তার সঙ্গে এই সম্পদের সরবরাহ সরাসরি যুক্ত। ফলে বেলজিয়ামের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ডিজিটাল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সেমিকন্ডাক্টর আর শুধু একটি শিল্পপণ্য নয়; এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। ভারত ইতিমধ্যেই দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের প্রযুক্তি ও গবেষণাগত সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলে ভারতের উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার জন্য ভারত যে ‘ইনভেস্টমেন্ট ফাস্ট-ট্র্যাক মেকানিজম’ তৈরি করেছে, সেটিও ইতিবাচক পদক্ষেপ। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে ভারত-বেলজিয়াম বিজনেস ফোরামকে নিয়মিত করার সিদ্ধান্ত দুই দেশের শিল্পমহলের যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করবে। আর্থিক, ফিনটেক এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সমন্বয়ও ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি অভিন্ন অবস্থান লক্ষ্যণীয়। ইউক্রেন এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের দ্রুত অবসানে সংলাপ ও কূটনীতির উপর জোর দেওয়া এবং সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের অঙ্গীকার বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ঐতিহ্যগত ভাবেই সংঘাতের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে। বেলজিয়ামের সঙ্গে এই বিষয়ে সমন্বয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে দুই দেশের সহযোগিতার আরও একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
ভারত-বেলজিয়াম সম্পর্কের শেকড় অবশ্য আরও গভীরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলজিয়ামের মাটিতে হাজার হাজার ভারতীয় সেনার সাহস ও আত্মত্যাগের স্মৃতি দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ
অধ্যায়। সেই ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে আজকের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে।