হিমালয় শুধু ভারতের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জলসম্পদ ও পরিবেশের অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার। এই পর্বতমালা থেকে অসংখ্য নদীর জন্ম, আর সেই নদীগুলির বিপুল জলধারা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এক বিরাট সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্প, নগরায়ণ, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তির প্রসারের ফলে আগামী দিনে বিদ্যুতের প্রয়োজন আরও বাড়বে। ফলে হিমালয়ের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা যে গুরুত্ব পাবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গিয়ে আমরা কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?
বাঁধ নির্মাণের ইতিহাস নতুন নয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জল সংরক্ষণের জন্য বাঁধ তৈরি করে এসেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন যুক্ত হওয়ার পর বাঁধের আকার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দুটোই বেড়েছে। আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নদীর গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো বিশাল প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। হিমালয়েও নদীর উজানে, ক্রমশ বেশি উচ্চতায় বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সমস্যা বাঁধে নয়, সমস্যাটি হল হিমালয়ের বিশেষ ভূপ্রকৃতি ও তার পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে এই বিপুল নির্মাণের ঝুঁকি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম নবীন ও ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় পর্বতমালা। এখানে ভূমিধস, ভূমিকম্প, আকস্মিক বন্যা এবং মেঘভাঙা বৃষ্টি নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এই স্বাভাবিক ঝুঁকিগুলিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সম্প্রতি ভোটেকোশী নদীর ভয়াবহ বন্যা আবার সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। হিমবাহ ভেঙে বিপুল জল ও বরফ নেমে এলে একটি নদী মুহূর্তের মধ্যে তার স্বাভাবিক চরিত্র বদলে ফেলতে পারে। কয়েক বছর আগে উত্তরাখণ্ডের ঋষিগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও আকস্মিক শিলা-বরফের ধস এবং বন্যার অভিঘাতে কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যে প্রকল্প তৈরিতে বহু বছর এবং বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, প্রকৃতির এক আকস্মিক আঘাতে তা কয়েক মিনিটেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে— এই বাস্তবতাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাঁধ তৈরির আগে প্রকৌশলীরা সাধারণত বহু বছরের বৃষ্টিপাত, নদীর জলপ্রবাহ এবং বন্যার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তার ভিত্তিতে নিরাপত্তার সীমা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে অতীতের তথ্য কি ভবিষ্যতের জন্য যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নির্দেশক? কয়েক দশক আগের বৃষ্টিপাতের হিসাব দিয়ে কি এমন একটি বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব, যেখানে লক্ষ লক্ষ টন বরফ, পাথর ও কাদা মুহূর্তের মধ্যে পাহাড় বেয়ে নেমে আসে?
হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তন এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বহু পাহাড়ি অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে বরফের সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়লে সেই বরফ গলতে থাকে, ঢালের স্থায়িত্ব কমে যেতে পারে। ফলে এমন বিপর্যয় ঘটতে পারে যার মাত্রা প্রচলিত বন্যার হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ, শুধু নদীর জল কতটা বাড়তে পারে তা হিসাব করলেই হবে না; পাহাড় নিজেই কখন ভেঙে পড়তে পারে, তার সম্ভাবনাও বিবেচনায় আনতে হবে।
এর অর্থ এই নয় যে ভারতকে জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে। সৌর ও বায়ুশক্তির পাশাপাশি জলবিদ্যুৎও ভারতের শক্তি-নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নদী ও পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে এর সম্ভাবনা যথেষ্ট। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই যে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
প্রয়োজন নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন। পুরনো সমীক্ষা ও কয়েক দশকের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, ভূমিধস, ভূমিকম্প এবং আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী প্রযুক্তি, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। প্রকল্পের খরচ বাড়লেও নিরাপত্তার মান কমানো
চলবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে লাভের পাশাপাশি ক্ষতির সম্ভাবনাটিও হিসাব করা। কোনও বাঁধ যদি নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও সামান্য ঝুঁকিতেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে, কিংবা তার ফলে মানুষ ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে, তাহলে সেই প্রকল্প নতুন করে ভাবা দরকার। প্রয়োজনে কোনও কোনও পরিকল্পনা বাতিল করতেও দ্বিধা থাকা উচিত নয়।
হিমালয়কে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভাণ্ডার হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যার সঙ্গে মানুষের জীবন, নদী, বন, জীববৈচিত্র্য এবং সমগ্র উপমহাদেশের জলনিরাপত্তা জড়িত। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি প্রকৃতির সীমাকে অগ্রাহ্য করে, তবে তার মূল্য একদিন অনেক বেশি দিতে হতে পারে। হিমালয়ে তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে তা নয়— কতটা নিরাপদে, কতটা দায়িত্বশীলভাবে এবং কতটা দীর্ঘস্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব।




