এনভার হক্সা, চার দশকের বেশি সময় ধরে এই দেশের অবিসংবাদিত কমিউনিস্ট প্রধান। সোভিয়েত, যুগোস্লাভিয়া, চিন— কাউকেই বিশ্বাস করতেন না তিনি। নিজের দেশের মানুষকেও না। সুতরাং, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের দশকগুলোতেও যে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সে দেশের সম্পর্ক খুব শীতল থাকবে, বলাই বাহুল্য!
বড়োই বিচিত্র ইতিহাস আর ভূরাজনীতির গতিবিধি। ইউরোপের দেশে দেশে ভূমধ্যসাগরের উপকূলে যেখানে হাশিখুশি ট্যুরিস্টদলের ভিড়ে জমজমাট শত শত রিসোর্ট, আলবানিয়ার উপকূল সেখানে নির্জন। উন্নয়নের জোয়ারে প্রকৃতির সম্পদ ভেসে যায়নি বলেই এখনও অক্ষত রয়েছে ইউরোপের শেষপ্রান্তের নদীমাতৃক বদ্বীপ, ইওসা যার নাম। পাশেই নার্তা লেগুন, ভূমধ্যসাগরীয় দুর্লভ প্রজাতির সীল মাছ থেকে ডালমাশিয়ান পেলিক্যান এবং আরও নানান সংকটাপন্ন প্রজাতির পাখি ও মাছেদের ভিড় সেখানে। দেখা মেলে মিশরীয় শকুন থেকে পরিযায়ী অনেক পাখিদের, ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় বর্ষে বর্ষে দলে দলে যাদের উড়াল। গোলাপি ডানার ফ্লেমিংগো উড়ে আসে হাজারে হাজারে, এই ভিজে মাটির টানে৷
সহসা পাল্টে গেল পরিস্থিতি। ঝলমলে চেহারার এক রাজকন্যে, ইভাঙ্কা ট্রাম্প যার নাম, লেগুন লাগোয়া একটি দ্বীপ তিনি চাইলেন। সাজন নামের সেই দ্বীপটি, নিজের একটি ব্যক্তিগত রিসোর্টে রূপান্তরিত করে সাজাবেন তিনি। রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ জারেদ কুশনার নামে রাজপুত্রের, গাজাতে মনের মতন রিসর্ট বানাতে না পেরে এই জায়গাটা তিনি চাইছেন বান্ধবীর জন্যে।
টাকাকড়ির অভাব হল না। উপসাগরীয় নানান দেশের নানান বন্ধুদল এগিয়ে এলেন। গন্ধে গন্ধে আলবানিয়ার উৎসুক বানিয়ারাও এগোলেন, তাঁরাই বা লাভের ভাগ কেন পাবেন না? অধিগ্রহণের আইনি ঝামেলা টামেলা দু’বছরের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়া গেল। দেওয়াল উঠলো স্থানীয় লোকজনের পাড়ার পাশে।
এলো বুলডোজার।
গোপনে গোপনে ছড়িয়ে পড়লো আসল খবর, শুধু সাজন দ্বীপটা নয়, উপকূলের আরও বেশ কিছুটা নিয়ে হাজারদুয়ারি হোটেল হবে। কুটীর তৈরি হবে। সমস্ত পৃথিবী জুড়েই যা চলছে আর কি— ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নিয়ে মানুষ লাভ করতে চায়৷ উদ্দেশ্য হয়ত গভীরতর। সাজন দ্বীপ যে ইভাঙ্কা ট্রাম্পেরই প্রথম পছন্দ হল, এমন তো নয়!
আড্রিয়াটিক আর ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে ওত্রান্ত প্রণালী। সেখানে নৌবহরের নজরদারি বহুদিন আগে থেকেই। ওই এলাকা যার দখলে, জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ তারই! দিনে দিনে এই জলপথের গুরুত্ব বেড়েছে। সম্প্রতি, হরমুজ প্রণালী নিয়ে গণ্ডগোল আরও জোরদার শিক্ষা দিয়ে গেছে!
সাবেক সোভিয়েত আমলে তৈরি অনেক সুড়ঙ্গ এই জায়গায় তো রয়েছেই। আছে ডুবোজাহাজ নোঙ্গর করার জায়গা, এমনকি পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র মজুত রাখা চলে, এমন বাঙ্কারও আছে। যতোই বিজ্ঞাপিত করা হোক বিলাসবহুল রিসর্টের ছবি, সুড়ঙ্গ ও প্রতিরক্ষার ব্যবস্থাপনাও তো মিথ্যে নয়!
এদিকে, গোলমাল বাধিয়েছে গোলাপি ডানার ওইসব পাখিরা। তারা তো ছিল না উন্নয়নের হিসেবের মধ্যে! তাদের ছুতো করে, জনগণ ক্ষেপে গেছে দেশের শাসকদলের ওপর। ফ্লেমিংগো পাখির ছবি দিয়ে পোস্টার বানিয়ে মিছিল হয়ে চলেছে টিরানার রাজপথে কিছুকাল ধরে, আওয়াজ উঠেছে, আলবানিয়া বিক্রি হবে না, হবে না! এ তো নিছক কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধাচার নয়। গভীরতর বিপ্লবের স্পন্দন রয়েছে এর মধ্যে।
সম্পদ ছেড়ে দিয়ে শাসকদলের এই আহরণমত্ততার বিরুদ্ধে এককাট্টা সমস্ত মত ও পথের মানুষ। অভিজ্ঞতায় তারা জেনেছে, জনগণের জমি ও প্রকৃতির সম্পদ কেড়ে উন্নয়নের নামে যত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তার অধিকাংশই পূরণ হয় না। কাজ জোটে না স্থানীয় লোকজনেরও।




