লকডাউনের সময় একটা ছবি খুব মনে আছে। তপ্ত পিচের রাস্তা। চারপাশে স্তব্ধতা। সামনে দীর্ঘ হাইওয়ে। সেই রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছেন এক নারী। কোলে দুধের শিশু। মাথার উপর চড়া রোদ। সামনে কত মাইল পথ—জানা নেই। পেছনে ফেরারও উপায় নেই।
কোনও শাস্ত্রজ্ঞ তাঁর হাত ধরতে এগিয়ে আসেননি। কোনও ধর্মরক্ষক তাঁর জন্য মণ্ডপ বানাননি। কোনও রাজনৈতিক নেতা পাশে দাঁড়িয়ে বলেননি, ‘মা, ভয় পেয়ো না।’ কিন্তু একজন শিল্পী থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই নারীকে তিনি ক্যানভাসে তুলে আনলেন। আর একদিন সেই ছবি হয়ে উঠল দুর্গা।
মুকুট নেই। ঝলমলে বেনারসি নেই। সোনার গয়না নেই। হাতে ত্রিশূলও নেই। আছে শুধু একটি শিশু। আর তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মায়ের সমস্ত শক্তি। ব্যস! তাতেই বিপদ।একদল ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মবোধে যেন ভূমিকম্প শুরু হল। মা দুর্গাকে নাকি ‘ভিখারি’ সাজানো হয়েছে! সনাতন ধর্মের অপমান! দেবীর অবমাননা!
তখন একটা ছোট প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে—দেবী দুর্গাকে (Durga Pujo) আমরা ঠিক কোথায় খুঁজি? মণ্ডপের প্রতিমায়, না কি সেই মায়ের মধ্যে, যিনি সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য পৃথিবীর সঙ্গে লড়েন? প্রশ্নটা একেবারেই নতুন নয়। বাঙালির দেবী কোনওদিনই দূরের, অপরিচিত কেউ ছিলেন না। রামপ্রসাদ তাঁকে ঘরের মেয়ে করেছেন। কখনও অভিমান করেছেন, কখনও বকেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের কাছেও কালী ছিলেন দূরের দেবতা নন—ছিলেন আপনজন।
আরও পড়ুন: বিশু পাগলেরা ফিরে ফিরে আসে
বাংলার ভক্তি-সংস্কৃতিতে দেবীকে নিজের করে নেওয়ার এই দীর্ঘ ঐতিহ্যই তো আছে।তাহলে একজন শিল্পী যখন আজকের একজন মায়ের মুখে দুর্গাকে খুঁজে পান, তখন এত আপত্তি কেন? সমস্যাটা কি সত্যিই দেবীর? নাকি আমাদের? শ্রীশ্রীচণ্ডীর সেই বহুচর্চিত পংক্তি মনে পড়ে—’যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।’/দেবী সর্বভূতে মাতৃরূপে বিরাজ করেন।/সর্বভূতে।/শুধু মণ্ডপের বেদিতে নয়।
তাহলে ইটভাটায় কাজ করা সেই মা, যিনি শিশুকে পিঠে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন—তিনি কোথায়? যে মা স্বামীর সঙ্গে শহরে এসে অচেনা জায়গায় সংসার পাতেন—তিনি কোথায়?যে মা লকডাউনে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শিশুকে কোলে নিয়ে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটেন—তিনি কোথায়?
তাঁদের মধ্যে দেবীকে (Durga Pujo)দেখতে গেলে আমাদের ধর্মবোধে এত অস্বস্তি কেন? হয়তো কারণ, মাটির দুর্গাকে পুজো করা সহজ।মাটির দুর্গা কোনও প্রশ্ন করেন না।রক্তমাংসের দুর্গা করেন। আর সেই জন্যই সম্ভবত তিনি বেশি অস্বস্তিকর। আমরা দুর্গার দশ হাত নিয়ে গর্ব করি। দশ হাতে দশ অস্ত্র—ত্রিশূল, চক্র, শঙ্খ, গদা, ধনুক-বাণ, বজ্র, খড়্গ…
অস্ত্র দেখলেই আমাদের চোখ চকচক করে। কিন্তু অস্ত্রগুলোর দিকে একটু অন্যভাবে তাকানো যায় না? ত্রিশূল শুধু লোহার তিনটি ধার নয়—শক্তির ভারসাম্যের প্রতীক হতে পারে। চক্র ন্যায়ের অনিবার্য গতি। শঙ্খ জাগরণের আহ্বান। গদা অহংকার ভাঙার শক্তি। ধনুর্বাণ লক্ষ্যভেদী একাগ্রতা। বজ্র অটল থাকার ক্ষমতা। খড়্গ অজ্ঞতার অন্ধকার কেটে ফেলার প্রতীক।
তাহলে দুর্গার (Durga Pujo) অস্ত্রগুলো আর নিছক অস্ত্র থাকে না। তারা হয়ে ওঠে মানুষের ভিতরের শক্তির ভাষা। আর সেই ভাষাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে লকডাউনের সেই মায়ের হাতে অস্ত্র না থাকলেও তিনি কি অস্ত্রহীন ছিলেন? কোলে সন্তান নিয়ে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে যে নারী হাঁটতে পারেন, তাঁর কাছে ত্রিশূলের কী দরকার?
তাঁর দুই হাতই যথেষ্ট।এক হাতে সন্তান। অন্য হাতে পৃথিবী। এখানেই শিল্পের কথাটা আসে। শিল্প কি শুধু সুন্দর জিনিস বানাবে?শিল্প কি শুধু চোখকে আরাম দেবে? শিল্প কি শুধু ধূপ-ধুনো, আলো আর আলোকসজ্জার মধ্যে নিরাপদে বসে থাকবে? বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস কিন্তু তা বলে না।
মহম্মদ আলি পার্কের কথা ধরা যাক। একসময় সেই পুজোর প্রতিমা দেখতে কলকাতার মানুষ ভিড় করত। প্রতিমা গড়তেন প্রবাদপ্রতিম মৃৎশিল্পী অলোক সেন। তাঁর প্রতিমায় দুর্গার হাতে চিরাচরিত অস্ত্র থাকত, কিন্তু অসুরের মুখে কখনও কখনও ফুটে উঠত সমকালীন সমাজ-রাজনীতির পরিচিত মুখের ব্যঙ্গাত্মক ছায়া। অর্থাৎ অসুর শুধু পুরাণে ছিল না। অসুর তখন আমাদের চারপাশেও হাঁটত।
আরও পড়ুন: সম্প্রীতির বন্ধন ‘রাখি’, বঙ্গভঙ্গের দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐক্যের ডাক
২০০৪ সালে আমি নিজে অলোক সেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তার আগে বেশ কয়েক বছর তিনি মহম্মদ আলি পার্কের প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল—মৃৎশিল্পীর হাতেও সময়কে দেখার চোখ থাকে। প্রতিমা শুধু পুজোর বস্তু নয়।সে সময়েরও দলিল হতে পারে। তখন এসব নিয়ে মানুষ আলোচনা করত, হাসত, মজা পেত। শিল্পীর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হতো।
আজ? আজ কোনও শিল্পী যদি অসুরের মুখে কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা-মন্ত্রী বা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক চরিত্রের আদল বসান, শিল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই প্রশ্ন উঠতে পারে—’ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে কি না।’
আসলে সমস্যা দুর্গার (Durga Pujo) দশ হাতে নয়। সমস্যা আমাদের একজোড়া চোখে। আমরা দুর্গার হাতে ত্রিশূল দেখতে পাই, কিন্তু শ্রমজীবী নারীর হাতে ধরা কোদাল দেখতে পাই না। দুর্গার বজ্র দেখতে পাই, কিন্তু সন্তানের জন্য সারাদিন কাজ করে যাওয়া মায়ের ক্লান্ত হাত দেখতে পাই না। দুর্গার অভয়মুদ্রা দেখতে পাই, কিন্তু সেই মাকে দেখি না, যিনি নিজের ভয় গিলে সন্তানকে বলেন—’ভয় পেয়ো না।’
দুর্গার (Durga Pujo) খড়্গ দেখে মুগ্ধ হই, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনতে পাই না। আমরা দেবীর শক্তিকে পাথর, মাটি আর ধাতুর মধ্যে বন্দি করে ফেলেছি। তারপর সেই শক্তির মালিকানা নিয়েও নিজেদের মধ্যে মারামারি করছি। অথচ দেবী যদি সত্যিই ‘সর্বভূতেষু’ থাকেন, তাহলে তাঁকে মণ্ডপের বাইরে খুঁজতে হবে।
রাস্তার ধারে। কারখানায়। ইটভাটায়। রেললাইনের পাশে। পরিযায়ী শ্রমিকের অস্থায়ী ঘরে। একজন মায়ের কোলে। আর কখনও কখনও একজন শিল্পীর ক্যানভাসে। সেই শিল্পী যখন পরিচিত দেবীর মুখ সরিয়ে আমাদের সময়ের একজন মায়ের মুখ বসান, তখন তিনি দেবীকে ছোট করেন না।বরং হয়তো আমাদের চোখ দুটো একটু বড় করে দেন।
দুর্গার হাতে দশটি অস্ত্র আছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো কোনও অস্ত্রেই নেই। সেটা আছে অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়। সন্তানকে আগলে রাখার ক্ষমতায়। ভয়কে অতিক্রম করার ক্ষমতায়। আর প্রয়োজন হলে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে বলার ক্ষমতায়— ‘তুমি যত বড়ই হও, অন্যায় করলে তুমি-ই অসুর।’
দেবীকে(Durga Pujo) যদি সত্যিই মানতে হয়, তাহলে তাঁর সোনার গয়না গুনে লাভ নেই।তাঁর শক্তিটা চিনতে হবে।নইলে মণ্ডপে যতই আলো জ্বালাই, যতই সোনা পরাই, যতই অস্ত্র সাজাই— দেবী থাকবেন মাটির প্রতিমায়, আর তাঁর শক্তি পড়ে থাকবে মণ্ডপের বাইরে।
দেখুন:




