বেআইনি নির্মাণ নিয়ে পুরসভার নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হতে গেলে জমির মালিক হওয়া জরুরি নয়। জনস্বার্থে কোনও তৃতীয় পক্ষ বা সচেতন নাগরিকও আদালতে মামলা করতে পারবেন। বেআইনি নির্মাণ শুধু জমির মালিকের বিষয় নয়, তা নাগরিক পরিষেবার উপর চাপ তৈরি করে। এমনকী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে। এমনই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের পোর্ট ব্লেয়ারের সার্কিট বেঞ্চের।
বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, কোনও বেআইনি নির্মাণের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করলে তৃতীয় পক্ষও রিট মামলা করতে পারেন।
মামলার সূত্রে জানা গিয়েছে, শ্রী বিজয়পুরমের একটি হোটেল ভবনে অনুমোদিত নকশার বাইরে বিপুল পরিমাণ নির্মাণ হয়েছিল। ওই নির্মাণ ২০১১ সালেই ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনের তরফে বেআইনি নির্মাণ ও দখল সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে সংবাদপত্রে আবেদন জানানো হয়। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে এক নাগরিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। পুরনো নির্মাণ ভাঙার নির্দেশ কার্যকর করার দাবি জানান।
হোটেল মালিকের দাবি ছিল, অভিযোগকারী ওই সম্পত্তির সঙ্গে যুক্ত নন। ফলে তাঁর করা মামলা গ্রহণযোগ্য নয়। সেই যুক্তি অবশ্য খারিজ করে দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টের দীপক কুমারের মুখোপাধ্যায় বনাম কলকাতা পুরসভা মামলার রায় উল্লেখ করে হাইকোর্ট জানায়, কোনও সচেতন নাগরিক বেআইনি নির্মাণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নজরে আনতেই পারেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, শহরাঞ্চলে অবাধ বেআইনি নির্মাণ নাগরিক পরিষেবার উপর বোঝা তৈরি করে। সেই সঙ্গে তা জনসাধারণের নিরাপত্তার পক্ষেও বিপজ্জনক। এর ফলে অন্য নাগরিকদের স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনও বিঘ্নিত হয়। বেঞ্চ আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব পড়তে পারে এমন বেআইনি নির্মাণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে সেই নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে রিট আদালতে যাওয়া যায়। অর্থাৎ, ‘বাড়ি আমার নয়, তাই অভিযোগও করতে পারব না’ এই যুক্তি খাটবে না।
মামলায় দেখা যায়, অনুমোদিত নকশায় ভবনটির মোট ফ্লোর এরিয়া ছিল মাত্র ২৯৩.৪৯ বর্গমিটার। অথচ বাস্তবে নির্মাণ হয়েছে ১,১৫৬.৫০ বর্গমিটার। অর্থাৎ, অনুমোদনের তুলনায় অতিরিক্ত নির্মাণ ৮৬৩.০১ বর্গমিটার। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, বেআইনি বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং সরকারি জমি দখলের অভিযোগও ছিল।
নির্মাণটি প্রশাসনিক নীতির আওতায় নিয়মিতকরণ করা সম্ভব। হোটেল মালিকের এই যুক্তিও পুরোপুরি মানেনি আদালত। বেঞ্চ জানায়, নিয়মিতকরণ কোনও নির্মাণকারীর অধিকার নয়। প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া তৈরি ভবনকে আদালত নিজের হাতে ‘বৈধ’ করে দিতে পারে না। আদালতের ভাষায়, ‘জুডিশিয়াল রেগুলারাইজেশন’-এর মাধ্যমে বেআইনি নির্মাণকে বৈধতা দেওয়া সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ বহাল রাখে। তবে প্রশাসনের সংশোধিত বা প্রস্তাবিত নিয়মিতকরণ প্রকল্প ওই নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা বিবেচনা করে তবেই ২০১১ সালের ভাঙার নির্দেশ কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই জন্য ভাঙার সময়সীমাও আরও আট সপ্তাহ বাড়িয়েছে আদালত।
আরও পড়ুন: খড়্গপুর আইআইটিতে ছাত্র মৃত্যুর রহস্য! সুবিচার চেয়ে হাইকোর্টে দ্বারস্থ পরিবার
বিচারপতি শম্পা সরকার এই মামলায় নাগরিক সমাজে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রশাসন চুপ থাকলে নাগরিকই আদালতের দরজায় কড়া নাড়তে পারেন। আর নির্মাণ যত বড়ই হোক, শুধু পরে নিয়মিতকরণের আশায় আইন ভাঙার ছাড়পত্র মিলবে না।




