• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 31 August, 2026

সৌরভের ‘বিগ বস বাংলা’-র মঞ্চে এসে হরভজন শুনিয়ে গেলেন এমন এক গল্প, যা আগে কখনো কাউকে বলেননি

হরভজনের বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, তাঁর জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা পাঞ্জাবে। কিন্তু তাঁকে ‘হরভজন’ বানিয়েছে কলকাতা। এ শহরের মানুষ

সৌরভের ‘বিগ বস বাংলা’-র মঞ্চে এসে হরভজন শুনিয়ে গেলেন এমন এক গল্প, যা আগে কখনো কাউকে বলেননি

Sourav Ganguly-Harbajan Singh Big Boss Bangla Photo-SNS

ইডেনে হ্যাটট্রিকের স্মৃতি যে তিনি কোনো দিন ভুলতে পারবেন না, তা স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই ভারতীয় কিংবদন্তি স্পিনার হরভজন সিংয়ের। এমনকী ইডেনই তাঁকে আসল হরভজন সিং বানিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাই কলকাতাও তাঁর প্রিয় শহর। কলকাতার প্রিন্স সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে তাঁর বড় ভাইয়ের স্থান দিয়েছেন বলে অকপটে স্বীকার করলেন ভাজ্জি। আর এত দিন যা কেউ জানত না, তা-ই জানিয়ে গেলেন বিগ বস্ বাংলার গ্র্যান্ড প্রিমিয়ারে এসে, যা এ বার সঞ্চালনার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।

এই ঝাঁ চকচকে অনুষ্ঠানে এসে সৌরভের পাশে দাঁড়িয়ে কোন ‘না বলা কথা’ জানিয়ে গেলেন হরভজন সিং? ২০০১-এ যে ইডেনে হ্যাটট্রিক করে অস্ট্রেলিয়ার হাত থেকে টেস্ট জয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, নিজের বাড়ি তৈরির সময় সৌরভের কাছে সেই ইডেনের মাটি চেয়েছিলেন ভারতীয় দলের তারকা স্পিনার। ইডেন গার্ডেন্সের একটু মাটি চেয়ে সৌরভকে তিনি বলেছিলেন, সেই মাটি নিজের বাগানে ছড়িয়ে দিতে চাই আমি, যাতে নিজের বাড়িতেও কলকাতার মাটির গন্ধ থাকে।

অসাধারণ এই ঘটনার কথা নিজেই সৌরভের পাশে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের জানিয়ে গেলেন হরভজন। এবং তাঁর এই কথাতেই বোঝা যায়, কলকাতা ও ইডেন গার্ডেন্স তাঁর কাছে ঠিক কতটা আপন। বিগ বসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই শহরই আমাকে এই হরভজন সিং বানিয়েছে। ইডেনে সে দিন সেই হ্যাটট্রিক না পেলে আজ লোকে আমাকে এত ভালবাসত বলে মনে হয় না। সেই হ্যাটট্রিকই আসলে আমাকে সেই হরভজন বানিয়েছিল, যে হরভজনকে আজ লোকে জানে ও চেনে।

যে শহর আমাকে ক্রিকেটের মঞ্চে এত পরিচিতি দিয়েছে, সেই শহরের মাটির সামান্য অংশও নিজের সঙ্গে রাখতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। সেই জন্যই দাদা-কে বলেছিলাম, আমার নতুন বাড়ি তৈরির জন্য ইডেনের একটু মাটি দিও। বাড়ির বাগানে সেই মাটি ছড়িয়ে রাখব, যাতে ইডেনের মাটির গন্ধ সব সময় পাই’।

যাদের বয়স এখন ২৫ বা তার কম, তাঁরা অনেকেই জানেন না, সেই টেস্টে হরভজন কী কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন ইডেনে। সেই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ৪৪৫ রান তোলে। প্রথম দিন অস্ট্রেলিয়া তখন ২৫২-৪। দিনের ৭২ নম্বর ওভারে বল করতে এসে দ্বিতীয় বলে রিকি পন্টিংকে ও তৃতীয় বলে অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে এলবিডব্লু-র ফাঁদে ফেলেন। চতুর্থ বলে শ্যেন ওয়ার্ন সদগোপন রমেশের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। সেই প্রথম টেস্টে কোনো ভারতীয় বোলার হ্যাটট্রিক করেন এবং হরভজন সিং সারা ক্রিকেট দুনিয়ায় বিখ্যাত হয়ে যান তাঁর সেই কীর্তির জন্য। তবে সেই ধাক্কা সামলেও অস্ট্রেলিয়া ৪৪৫ রান তোলে।

Harbhajan Singh Photo-SNS
Harbhajan Singh Photo-SNS

কিন্তু ভারত তার জবাবে ১৭১ রানেই অল আউট হয়ে যায়। খেলা ঘুরতে শুরু করে এর পরেই। ফলো-অন করে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ভারত ৬৫৭ রান তুলে ডিক্লেয়ার করে। ভিভিএস লক্ষ্ণণের ২৮১ ও রাহুল দ্রাবিড়ের ১৮০ রানের ইনিংস এবং তাঁদের ৩৭৫ রানের নজির গড়া পার্টনারশিপ ভারতকে এই জায়গায় এনে দেয়।

জয়ের জন্য ৩৮৪ রানের লক্ষ্য নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া এবং ২১২ রানে অল আউট হয়ে যায়। ছয় অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানকে প্যাভিলিয়নে ফিরিয়ে দিয়ে সেই জয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন সেই হরভজনই। প্রথম ইনিংসে ছয় ও দ্বিতীয় ইনিংসে সাত— মোট ১৩ উইকেট নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা স্পিনার।

সে জন্যই ইডেনকে নিয়ে তিনি এতটা আবেগতাড়িত যে, সেই ইডেনের মাটিও ছড়িয়ে রেখে দিয়েছেন নিজের বাড়ির বাগানে।

রবিবার ‘বিগ বস বাংলা’র গ্র্যান্ড প্রিমিয়ারে প্রাক্তন সতীর্থকে সামনে পেয়ে সৌরভও ফিরে যান তাঁর ক্রিকেটজীবনের সোনালি দিনগুলিতে। হরভজনও ছিলেন ফুরফুরে মেজাজে। বলেন, ‘দাদা অনেকটা মিষ্টি দইয়ের মতো— খুব ভাল’। তাঁর জীবনে সৌরভের অবদান কতটা, তা বলতে গিয়ে হরভজন জানান, ‘দাদা এমন একজন মানুষ যে আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে। যেদিন থেকে দাদা আমার হাত ধরেছে, সেদিন থেকেই বড় ভাইয়ের মতো আমাকে আগলে রেখেছে’।

উত্তরে সৌরভ বলেন, ‘ভাজ্জির জীবন আমি বদলে দিয়েছি— এমনটা বলা হলেও সত্যিটা একটু অন্যরকম। ২০০১-এ প্রথম টেস্ট ম্যাচ হারের পর ইডেন গার্ডেন্সে হরভজন নিজেই নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল’। সৌরভ মজার ছলে বলেন, ‘ইসিনে মেরি ক্যাপ্টানি বাঁচাই হ্যায়।’

হরভজনের বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, তাঁর জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা পাঞ্জাবে। কিন্তু তাঁকে ‘হরভজন’ বানিয়েছে কলকাতা। এ শহরের মানুষ এবং এখানকার ভালবাসা তাঁর ক্রিকেটজীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, পাঞ্জাবি হওয়ার পাশাপাশি তিনি খানিকটা বাঙালিও হয়ে গিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, মা কালীর আশীর্বাদ রয়েছে কলকাতার উপর। আর যতবার এই শহরে খেলেছেন, ততবারই এই শহর তাঁকে কখনো খালি হাতে ফেরায়নি।

বিগ বসের মঞ্চে এসে হরভজন সিংয়ের সাফ কথা, ‘এই ঘরে বিগ বসের রাজত্ব চলতে পারে। তবে আমাদের কাছে বিগ বস একজনই ছিল, আছে এবং থাকবে। সে আমাদের দাদা’। অর্থাৎ তাঁর কাছে সৌরভই চিরকাল সেই দাদা, সেই বস্, যাঁর জায়গা অন্য কেউ নিতে পারবেন না।