• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 28 August, 2026

সম্প্রীতির বন্ধন ‘রাখি’, বঙ্গভঙ্গের দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐক্যের ডাক

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, বাংলার ৩০ আশ্বিন ১৩২২ বঙ্গাব্দে কার্যকর হয় বঙ্গভঙ্গ। সেই দিনটিকেই বাঙালির ঐক্যের প্রতীক করে তুলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সহযোদ্ধারা

সম্প্রীতির বন্ধন ‘রাখি’, বঙ্গভঙ্গের দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐক্যের ডাক

Image: SNS

আজ রাখিবন্ধন (Rakhi Bandhan) উৎসব। ঘরে ঘরে পালিত হচ্ছে এই উৎসব। রাখি মানে কি শুধুই ভাইয়ের হাতে বেঁধে দেওয়ার বোনের ভালোবাসার সুতো! রাখির  (Rakhi Bandhan)সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরাণ, ধর্ম, ইতিহাস, দেশপ্রেম এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের গল্প। ভাই-বোনের স্নেহের প্রতীক শুধু নয়, বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যের বার্তাও রাখি।

মহাভারতে শিশুপাল বধের সময় শ্রীকৃষ্ণের রক্তাক্ত হাতে দ্রৌপদী তাঁর ওড়নার অংশ ছিঁড়ে বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই থেকেই ভাইকে রক্ষার প্রতীক হিসেবে রাখি পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু বাংলার ইতিহাসে রাখি এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল। সেই গল্পের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে রয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৯০৪-০৫ সাল। ভারত তখন ব্রিটিশের অধীন। পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে চাইছে দেশবাসী। আর ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন চাইছেন বঙ্গভঙ্গ করতে। কার্জনের এই সিদ্ধান্তে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলা। বাংলা ভাগের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে চারিদিকে শুরু হয়েছিল প্রতিবাদ। স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল গ্রাম থেকে শহরে।

আরও পড়ুন: বিশু পাগলেরা ফিরে ফিরে আসে

কবিগুরুও (Rabindranath Thakur) তখন নীরব থাকতে পারেননি। তাঁর কলমে থেকে একের পর এক বেরিয়েছিল স্বদেশি গান ও কবিতা। তাঁর লেখায় ছিল ভয়কে জয় করার দুঃসাহসিক আহ্বান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। তিনি লিখলেন, ‘ধর্ম আমার মাথায় রেখে/ চলব সিধে রাস্তা দেখে/ বিপদ যদি এসে পড়ে/ সরব না, ঘরের কোণে সরব না, দু-বেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না/ আমি ভয় করব না ভয় করব না।/’

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, বাংলার ৩০ আশ্বিন ১৩২২ বঙ্গাব্দে কার্যকর হয় বঙ্গভঙ্গ। সেই দিনটিকেই বাঙালির ঐক্যের প্রতীক করে তুলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। ধর্ম কিংবা পৌত্তলিকতাকে কোনওদিনই নিজের জীবনে স্থান দেননি রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলতেন, ‘আমার জীবনের মহামন্ত্র পেয়েছি উপনিষদ থেকে’। ব্রহ্মের কাছে বারংবার নতজানু হলেও প্রতিষ্ঠানিক ধর্মকে স্থান দেননি কবি কোনও কালেই।   ভূপেন্দ্রনাথ বসু, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বিপিনচন্দ্র পাল-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ঐক্যের ডাক দেন।

বিভাজনের জবাব দিতে চেয়েছিলেন ঐক্য দিয়ে। মানুষের হাতে মানুষের রাখি পরিয়ে দিতে হবে। ধর্মের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালির সত্ত্বাই হবে প্রধান। সেই দিনের জন্য প্রচারপত্রও বিলি করা হয়েছিল। সেখানে সংযমের পাশাপাশি দিনটিকে প্রতি বছর বাঙালির রাখিবন্ধনের দিন হিসেবে স্মরণ করার কথা বলা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: নেতাজির পাশে বিউগল বাজাতে দেখা যায়- এই ব্যক্তিকে চেনেন, এঁর উত্তরাধিকারী কোথায় জানেন?

রবীন্দ্রনাথের  (Rabindranath Thakur) সেই উদ্যোগের স্মৃতি ধরা আছে রানি চন্দ সম্পাদিত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে। রবি কাকার সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে অবন ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘ঠিক হল সকালবেলা সবাই গঙ্গায় স্নান করে সবার হাতে রাখি পরাব। এই সামনেই জগন্নাথ ঘাট, সেখানে যাব। রবি কাকা বললেন  সবাই হেঁটে যাব, গাড়িঘোড়া নয়। গঙ্গাস্নানের উদ্দেশে, রাস্তার দু’ধারে বাড়ির ছাদ থেকে আরম্ভ করে ফুটপাথ অবধি লোক দাঁড়িয়ে গেছে। মেয়েরা খই ছড়াচ্ছে, শাঁক বাজাচ্ছে, মহা ধুমধাম, যেন একটা শোভাযাত্রা দিমুও ছিল সঙ্গে, গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে মিছিল চলল।‘ রবীন্দ্রনাথের ডাক উপেক্ষা করতে পারেনি কেউ। সেদিন গাওয়া হয়েছিল-‘বাংলার মাটি, বাংলার জল/ বাংলার বায়ু, বাংলার ফল/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।‘

অবন ঠাকুরের (Rabindranath Thakur) কথায়, ‘ঘাটে সকাল থেকে লোকে লোকারণ্য, রবিকাকাকে দেখবার জন্য আমাদের চার দিকে ভিড় জমে গেল। স্নান সারা হল।  সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল এক গাদা রাখি। সবাই এ ওঁর হাতে রাখি পরালুম। অন্যরা যারা কাছাকাছি ছিল তাদেরও রাখি পরানো হল। হাতের কাছে ছেলেমেয়ে যাকে পাওয়া যাচ্ছে, কেউ বাদ পড়ছে না, সবাইকে রাখি পরানো হচ্ছে। গঙ্গার ঘাটে সে এক ব্যাপার। পাথুরেঘাটা দিয়ে আসছি, দেখি বীরু মল্লিকের আস্তাবলে কতকগুলো সহিসকে হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন রবিকাকা। রাখি পরিয়ে আবার কোলাকুলি, সহিসগুলো তো হতভম্ব। হঠাৎই রবি কাকার খেয়াল গেল চিৎপুরের বড়ো মসজিদে গিয়ে সবাইকে রাখি পরাবেন। হুকুম হল, চলো সব।  রওনা হলুম সবাই। গেলুম মসজিদের ভিতরে, মৌলবীদের হাতে রাখি পরিয়ে দিলুম। ওরা একটু হাসলে মাত্র।‘

আরও পড়ুন: বঙ্গের মনসা দেবী এবং গ্রিক দেবী মেডুসা কি একই? এই দুই দেবীর সংগ্রামের বিষয়ে জানেন?

তবে রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Thakur) সেই দিনের রাখিবন্ধনের সঙ্গে আজকের রাখিবন্ধনের মিল নেই। বর্তমানে রাখি উৎসব পালিত হয় শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায়। আর রবীন্দ্রনাথের ঐক্যের রাখি পালিত হয়েছিল আশ্বিনে, বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন।রবীন্দ্রনাথের ‘জীবস্মৃতি’ অনুসারে ক্ষেত্রমোহন কথক ঠাকুর রাখি উৎসবের মন্ত্র বাতলে দিয়েছিলেন।

সেই সময় এই বিশেষ রাখিবন্ধন (Rakhi Bandhan) উৎসব পঞ্জিকাতেও স্থান পেয়েছিল। পরে অবশ্য সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গিয়েছে। তবু শ্রাবণের রাখি এলেই ফিরে আসে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি। ১৯০৫ সারে রাখিবন্ধন উৎসব ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের দলিল নয়, সম্প্রীতির বন্ধন।

দেখুন: রাখি বন্ধনে সেনা জওয়ান, ভালোবাসায় সামিল কাশ্মীরি কন্যারা