অক্ষরসমুদ্র সম্বলিত একটি পুস্তক বা পত্রিকা নিতান্তই জড় পদার্থ। পাঠক–পাঠিকার মন্থনেই তার ভেতর থেকে উঠে আসে অমৃত, তাঁদের হাতেই বই প্রাণ পায়। পাঠকই বইয়ের আসল স্রষ্টা। দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছরের গ্রন্থাগারিক জীবনে স্কুল, কলেজ ও ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারে কাজ করতে গিয়ে এই সত্যটি বারবার উপলব্ধি করেছি— পাঠক তৈরির ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারের কোনও বিকল্প নেই। আমার কর্মজীবন শুরু নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন লোকশিক্ষা পরিষদের ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারে। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে সেই গ্রন্থাগার শিক্ষার প্রসার ও পাঠক সৃষ্টিতে আজও যে ভূমিকা পালন করে চলেছে তা প্রশংসার দাবী রাখে।
পরবর্তীকালে স্কুল ও কলেজে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, পাঠককে বই পড়ার নেশা একবার ধরিয়ে দিতে পারলে আর দেখতে হবে না। এই নেশার মাদকতা বহু সাধারণ ছাত্রকে অসাধারণ মানুষে পরিণত করেছে, তাদের চিন্তা, মনন ও মানসিক দৃঢ়তায়।
গ্রন্থাগারিক ও গ্রন্থাগারকর্মীর মূল কাজ শুধু বই রক্ষণাবেক্ষণ নয়, মূল কাজ পাঠ্যবস্তুর সঙ্গে পাঠকের মিলন ঘটানো এবং তার ভেতর আগ্রহের আগুন জ্বালিয়ে রাখা। বই যে মানুষের জীবনে কতটা গভীর আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ পড়েছিলাম কোনও এক পত্রিকায়।
এক বিপত্নীক বৃদ্ধ, যাঁর একমাত্র সন্তান বিদেশে, বইকেই জীবনের একমাত্র অকৃত্রিম বন্ধু করে নিয়েছিলেন। পঞ্চাশ হাজার টাকা হাতে দিয়ে বইমেলা থেকে বই কিনে আনার অনুরোধ করেছিলেন লেখককে। তাঁর কাছে বই ছিল নিছক সংগ্রহ নয়— জীবনের অবলম্বন। এই গভীর প্রেম -শ্রদ্ধা জাগায়, ভাবায়।
বইয়ের প্রসঙ্গ এলেই আমার নব্বই বছর বয়সী মায়ের কথা মনে পড়ে। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা, সারাদিন সংসারের কাজ, তবু রাতে হ্যারিকেনের আলোয় বই পড়া— এই অভ্যাসই আজও তাঁকে মানসিকভাবে সতেজ রেখেছে।
গ্রামের ‘মিলন সংঘ’ গ্রন্থাগার না থাকলে তাঁর পাঠাভ্যাস গড়ে উঠত না। নিরক্ষরতা দূরীকরণ প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নিয়মিত পড়ার সুযোগ না পেলে বহু মানুষ আবার নিরক্ষর হয়ে যান। গ্রন্থাগার সেই ধারাবাহিকতার একমাত্র ভরসা।
আজ চারদিকে মানসিক অবসাদ, একাকীত্ব ও মনোরোগের বাড়বাড়ন্ত। বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দাপটে জীবন যত যান্ত্রিক হয়েছে, বইয়ের প্রয়োজন ততই অবহেলিত হয়েছে। অথচ বই পড়লে মন উদার হয়, চিন্তা মুক্ত হয়, একাকিত্ব দূর হয়, চিত্ত ভয়শূন্য হয়। এমন শক্তিশালী মানসিক ও সামাজিক ওষুধ আর নেই। আমি নিজে কম্পিউটারবিহীন সময়ে গ্রন্থাগারবিজ্ঞানে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে ই-বুক ও ই-জার্নাল নিয়ে কাজ করেছি। তবু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে— অনলাইনে পড়ার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ এখনও সীমিত। তারা প্রয়োজনীয় অংশ জেরক্স করে পড়তেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে। অর্থাৎ, পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠার জন্য এখনও বই ও গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগ আশার আলো দেখায়। ক্যানিংয়ে এক বন্ধুর বাড়ির গ্রন্থাগার কিংবা মুর্শিদাবাদের ডোমকলে ‘বই বাড়ি’ এই উদ্যোগগুলি প্রমাণ করে, গ্রন্থাগার মানেই ইট–সিমেন্টের দালান নয়, এটা এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। পশ্চিমবঙ্গে ২৪৮০টি সাধারণ গ্রন্থাগারে ৫৬০০ পদের মধ্যে ৩৫৫৫টি শূন্য। ২০০৭ সালের পর নিয়োগ নেই। বহু গ্রন্থাগার কর্মীর অভাবে তালাবন্ধ।
পূর্ব মেদিনীপুরে প্রয়োজনের মাত্র ২১ শতাংশ কর্মী কর্মরত। এই অবস্থা শিক্ষার পরিপন্থী, পাঠক সৃষ্টির পথে বড় বাধা। গ্রন্থাগার বন্ধ মানে শুধু পাঠক হারানো নয়— এর প্রভাব পড়ছে প্রকাশনা শিল্পেও। অস্থায়ী বই বিপণি ও বইমেলার বড় ক্রেতা গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগার পাঠক তৈরি করে, পাঠক বইমেলাকে ঋদ্ধ করে। এই শৃঙ্খল ভেঙে গেলে বইমেলার জৌলুসও ম্লান হবে। আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলা কিংবা জেলা, বড় শহর বা বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে হওয়া বইমেলা জেলায় শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি পাঠক, লেখক ও প্রকাশকের মিলনমেলা। কিন্তু পাঠকের শিকড় যদি শুকিয়ে যায়, তবে এই উৎসবও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
অতএব দাবি একটাই— গ্রন্থাগার ব্যবস্থা অবিলম্বে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনা হোক। এর জন্য নিয়োগ করতে হবে গ্রন্থাগারকর্মী, খুলে দিতে হবে বন্ধ দরজা। গ্রাম থেকে শহর, জেলা থেকে রাজ্য, গ্রন্থাগার ব্যবস্থা যত শক্তিশালী হবে, পাঠাভ্যাসের ভিত তত মজবুত হবে, তত উজ্জ্বল হবে ভবিষ্যৎ। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বই কেবল জাদুঘরের বস্তু হয়ে থেকে যাবে।
আমরা কি চাই আমাদের উত্তরসূরিরা কেবল যান্ত্রিক স্ক্রিনে বন্দি থাকুক? নাকি চাই তারা বইয়ের পাতায় খুঁজে পাক মুক্তির স্বাদ? কারণ বই শুধু কাগজের গাঁথুনি নয়, বই প্রাণের বন্ধু, সমাজের মানসিক খাদ্য। পাঠক তৈরি করা তাই নিছক দায়িত্ব নয়, এক মহৎ সমাজসেবা।




