সহযোদ্ধাদের তিহাড় জেলে পাঠানো এবং ৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদস্থল যন্তরমন্তরকে সরকারি নির্দেশে বিক্ষোভের তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলার তীব্র বিরোধিতায় এবার রাজধানীর বুকে এক নজিরবিহীন প্রতিবাদের ডাক দিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party-CJP)। আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ষষ্ঠীর দিন বিকেল ৫টায় নতুন দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসের (Connaught Place-CP) সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা হাতে জমায়েতের আহ্বান জানিয়েছেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে (Abhijeet Dipke)। ‘লহরা দো তিরঙ্গা’ (Lehra Do Tiranga) নামের এই কর্মসূচির ডাক দিয়ে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে দেশের গণতন্ত্র রক্ষা করা কোনও অপরাধ হতে পারে না, এই কারণে প্রশাসন যদি তাঁকে গ্রেপ্তার করতে চায়, তবে তিনি হাসিমুখে জেলে যেতে প্রস্তুত।
আক্রোশের রাজনীতি
গত কয়েক দিন ধরেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner-CEC) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (Special Intensive Revision-SIR) প্রত্যাহারের দাবিতে দিল্লিতে জোরদার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে নাগরিক মঞ্চ সিজেপি ও দেশের প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলি। রাজপথ দাপিয়েছে ইন্ডিয়া জোটও। মঙ্গলবার সকালে যন্তরমন্তর থেকে আটক করা হয়েছিল সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে। দিল্লির বিশেষ আদালত তাঁদের পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে (judicial custody) তিহাড় জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
সহকর্মীদের এই গ্রেপ্তারিকে প্রকাশ্য প্রতিহিংসা হিসেবে দেগে দিয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যেই তোপ দেগেছেন যে, শান্তিপূর্ণ অবস্থানে দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনও অপরাধ নয়, যুবসমাজকে এইভাবে জেলে পোরা সরকারের ভীরুতার লক্ষণ। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে, শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরে, তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র থেকে শুরু করে কেরলমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন– প্রত্যেকেই আন্দোলনকারীদের সমর্থনে সুর চড়িয়েছেন। তেলঙ্গানার প্রাক্তন মন্ত্রী ও বিআরএস-নেতা কেটি রামারাও এই পদক্ষেপকে কার্যত দেশে জরুরি অবস্থার নতুন অধ্যায় বলে চিহ্নিত করেছেন।
কনট প্লেসে নতুন রণক্ষেত্র
আন্দোলনের ঝাঁঝ কমাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও দিল্লি পুলিশ সম্প্রতি এক নজিরবিহীন নির্দেশিকায় যন্তরমন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়েছে। বদলে শহর থেকে দূরে বুরারি, রামলীলা ময়দান কিংবা সিবিডি ময়দানকে বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পুলিশের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে নাগরিক সংগঠনগুলি। তাদের যুক্তি, মূল শহর থেকে দূরে পাঠিয়ে নাগরিকদের প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কার্যত হরণ করা হচ্ছে।
প্রশাসনের এই কৌশলকে টেক্কা দিতেই এবার দিল্লির বাণিজ্যিক হৃদপিণ্ড কনট প্লেসকে বেছে নিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে। বুধবার দিল্লি বিমানবন্দরে পা রাখা মাত্রই কিছু যাত্রী তাঁর বিরুদ্ধে চিৎকার শুরু করলেও অবিচল মেজাজে তিনি স্পষ্ট জানান, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ জমানার পর এই প্রথম নিজের দেশে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর দায়ে যুবকদের বন্দি করা হচ্ছে। দেশের অঘোষিত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ ভারতবাসীকে তেরঙা হাতে নিয়ে সেন্ট্রাল পার্কে পৌঁছনোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বাম ছাত্র সংগঠনগুলিও যন্তরমন্তর পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে এই প্রতিবাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে শুক্রবারের এই তিরঙ্গা সমাবেশকে কেন্দ্র করে লুটিয়েন্স দিল্লির বুকে নতুন করে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে।




