• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 30 October, 2026

মাসিকের যন্ত্রণা এড়াতে জরায়ু বাদ, মহারাষ্ট্রের আখখেতে নারী শ্রমিকদের কঠিন বাস্তবতা

মাসিকের যন্ত্রণা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধির অভাব— এই তিনের চাপে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে মহারাষ্ট্রের আখখেতে

মাসিকের যন্ত্রণা এড়াতে জরায়ু বাদ, মহারাষ্ট্রের আখখেতে নারী শ্রমিকদের কঠিন বাস্তবতা

pic- ai

মাসিকের যন্ত্রণা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধির অভাব— এই তিনের চাপে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে মহারাষ্ট্রের আখখেতে কর্মরত বহু নারী শ্রমিক। মাসিকের কারণে কাজ থেকে বিরতি নিলে মজুরি কাটা কিংবা জরিমানার আশঙ্কা থাকে। সেই আর্থিক চাপ সামলাতে গিয়ে কিছু নারী শ্রমিক মাসিকজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু অপসারণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে বিভিন্ন সমীক্ষা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতি ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, প্রজননস্বাস্থ্য এবং শ্রমিক
অধিকার নিয়ে।
মহারাষ্ট্রের আখ কাটার কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের স্থানীয়ভাবে ‘কয়তা’ বলা হয়। সাধারণত স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে আখ কাটা, বাঁধা এবং বোঝাইয়ের কাজ করেন। কাজের চুক্তি, অগ্রিম নেওয়া টাকা এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ আখ কাটার লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দায় তাঁদের উপর থাকে।
ফলে দৈনিক কাজের সময় অনেক ক্ষেত্রেই ১৩ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছয় বলে বিভিন্ন সমীক্ষা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করেও তাঁদের কর্মপরিবেশে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাব থেকে যাচ্ছে।
মাসিকের সময়েও কাজের চাপ:
আখ কাটার কাজ অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। অথচ বহু কর্মস্থলে পর্যাপ্ত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার কিংবা মাসিকের সময় স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ। ফলে মাসিক চলাকালীন পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, স্যানিটারি ন্যাপকিন বা অন্যান্য সামগ্রী পরিবর্তন করা এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার উপর রয়েছে কাজ বন্ধ রাখলে মজুরি হারানো কিংবা ঠিকাদারের জরিমানার ভয়। সব মিলিয়ে মাসিকের স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াটিও নারী-শ্রমিকদের কাছে বাড়তি আর্থিক ও শারীরিক বোঝা হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে মাসিকের ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত এবং অন্যান্য স্ত্রীরোগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের একাংশ জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করাচ্ছেন বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অস্ত্রোপচারকে বলা হয় হিস্টেরেকটমি। তবে মাসিক বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বা কর্মক্ষেত্রে অসুবিধা এড়াতে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া জরায়ু বাদ দেওয়া যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এটি একটি বড় অস্ত্রোপচার। এর ফলে ভবিষ্যতে নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ এবং যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বিড জেলায় উদ্বেগজনক ছবি:
মহারাষ্ট্রের বিড জেলা থেকে বহু শ্রমিক আখ কাটার কাজে অন্য অঞ্চলে পাড়ি দেন। এই জেলার নারী শ্রমিকদের মধ্যে জরায়ু অপসারণের প্রবণতা নিয়ে অতীতে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রকের তরফে সংসদে দেওয়া এক উত্তরে জানানো হয়েছিল, বিড জেলার ৯৯টি বেসরকারি হাসপাতালে ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯— এই তিন অর্থবর্ষে মোট ৪,৬০৫টি জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার হয়েছিল।
যদিও এই পরিসংখ্যানের সব অস্ত্রোপচারই আখ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে হয়েছিল কিংবা সেগুলি চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। তবে পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে নারী আখশ্রমিকদের মধ্যে হিস্টেরেকটমির প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দারিদ্র্য, ঋণের দায়, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, চিকিৎসা পরিষেবার সীমাবদ্ধতা এবং মাসিকের কারণে কাজ বন্ধ রাখলে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা— এই সব কিছুর সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ:
বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক অধিকারকর্মীদের মতে, এই সমস্যার সমাধান শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আখখেতে নিরাপদ পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, স্যানিটারি সামগ্রী, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, মাসিক বা অসুস্থতার কারণে কাজ থেকে বিরতি নিলে যাতে নারী শ্রমিকদের মজুরি কাটা বা জরিমানার মুখে পড়তে না হয়, সেই বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নারী শ্রমিকদের প্রজননস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সুরক্ষিত করতে হবে। জীবিকা হারানোর ভয় কিংবা কর্মক্ষেত্রের প্রতিকূল পরিস্থিতি যেন কাউকে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের দিকে ঠেলে না দেয়, তা নিশ্চিত করা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরের দায়িত্ব। শ্রম দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর, আখশিল্পের সঙ্গে যুক্ত সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।