ভারতের শিল্পজগতে টাটা গোষ্ঠীর গুরুত্ব শুধু তার বিপুল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তির বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ভাবমূর্তি তৈরিতে এই গোষ্ঠীর অবদান দীর্ঘদিনের। ফলে টাটা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন তা নিছক একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাগত সমস্যা হিসেবে দেখার অবকাশ থাকে না। বিশেষ করে সেই বিরোধের সঙ্গে যখন রাজনৈতিক মহলের নাম জড়িয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে, দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলি কি নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পূর্ণ স্বাধীন?
সম্প্রতি টাটা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিয়ে চলতে থাকা বিরোধকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস নেতা তথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে যে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা এই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এই বিতর্কে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে অর্থমন্ত্রীর আক্রমণের ভাষা। তিনি শুধু রাহুলের অভিযোগ খণ্ডন করেননি, বরং তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, কংগ্রেসের অতীত শাসন এবং বিরোধী নেতার দায়িত্ববোধ নিয়েও সরাসরি
প্রশ্ন তুলেছেন।
রাহুল গান্ধী তাঁর এক্স পোস্টে অভিযোগ করেছেন, টাটা গোষ্ঠীকে অপরাধমূলকভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, অথচ দেশের কোনও শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী নেতা এ বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। তাঁর প্রশ্ন, ব্যবসায়ীরা কত দিন এভাবে নীরব থাকবেন? তাঁরা কি অপেক্ষা করছেন, যত দিন না তাঁদের নিজেদের অস্তিত্বও অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়? রাহুলের বক্তব্য, ভারতের ব্যবসা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ব্যক্তিগত খেলার সামগ্রী নয়। তাঁর কথায়, ব্যবসায়ীদের সাহসের অভাব থাকতে পারে, কিন্তু কংগ্রেসের সেই সাহস আছে এবং এই অন্যায়ের বিচার তারা নিশ্চিত করবে।
রাহুলের বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট। তিনি টাটা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিরোধকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছেন। তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে এই ধারণা যে, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় কয়েকটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ছাড়া অন্য ব্যবসায়ীরা নিজেদের মত প্রকাশ করতে বা স্বাধীনভাবে কাজ করতে নিরাপদ বোধ করছেন না। অর্থাৎ, শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শিল্পপতিদের স্বাধীনতা এবং সরকারের
সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন
তুলেছেন তিনি।
কিন্তু রাহুলের এই আক্রমণের জবাবে নির্মলা সীতারামন যে ভাষায় পাল্টা আঘাত করেছেন, তা নিছক অর্থমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সরাসরি রাজনৈতিক আক্রমণ। তিনি রাহুলকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। প্রতিটি বিষয়কে রাজনীতির রং দেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, কোনও বাণিজ্যিক বা আইনি বিরোধকে প্রমাণ ছাড়াই অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এর পরেই আরও তীব্র হয়েছে তাঁর আক্রমণ। সীতারামনের অভিযোগ, রাহুল গান্ধী বারবার ভারতীয় শিল্পের সাফল্য এবং দেশের উদ্যোগপতিদের কৃতিত্বকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেন। এবার কি তিনি ব্যবসায়ী নেতাদেরও নিজের সঙ্গে নিয়ে অবিশ্বাস ও বিষাক্ত পরিবেশ ছড়াতে চাইছেন? অর্থাৎ, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে রাহুলের সমালোচনা শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, দেশের শিল্প ও
ব্যবসায়িক পরিবেশের পক্ষেও ক্ষতিকর— এই অভিযোগ স্পষ্ট।
এখানেই থেমে থাকেননি নির্মলা। তিনি কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনকালকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে লাইসেন্স-কোটা রাজের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, কয়েক দশক ধরে কংগ্রেস ভারতীয় উদ্যোগপতিদের স্বাধীন উদ্যোগের মনোভাবকে শ্বাসরুদ্ধ করেছে এবং দেশের কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বিপরীতে, মোদী সরকার শিল্পকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখে। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি, উদ্যোগের প্রসার এবং শিল্পের বিকাশই বর্তমান সরকারের নীতির লক্ষ্য।
এই তুলনার মাধ্যমে সীতারামন কার্যত রাহুলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা, যে দলের শাসনে শিল্পের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছিল, সেই দলের নেতা আজ শিল্পপতিদের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছেন কীভাবে? এটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ। রাহুলের অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে তিনি কংগ্রেসের অতীতকে সামনে এনে
বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতির পক্ষে সওয়াল করেছেন।
তবে রাহুলও পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেননি। তিনি অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন তুলেছেন, কোন বাণিজ্যিক বা আইনি প্রয়োজনের কারণে টাটা ট্রাস্টস এবং টাটা সন্সের প্রতিনিধিদের অমিত শাহের বাসভবনে যেতে হয়েছিল? তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্ন, এই ঘটনায় আদানি গোষ্ঠীর কর্ণধার গৌতম আদানির ভূমিকা কী হতে চলেছে? পাশাপাশি তিনি দাবি করেছেন, সরকারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি ছাড়া দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ীই সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট। ফলে রাহুলের বক্তব্য, ব্যবসায়ীদের কাউকে প্ররোচিত করার প্রয়োজন নেই, তাঁদের অসন্তোষের নিজস্ব কারণ রয়েছে।
টাটা গোষ্ঠীর বিরোধের প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা, টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদের
১৭ সেপ্টেম্বরের একটি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ওই সিদ্ধান্তে এন চন্দ্রশেখরনের চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগের বিষয়টি ছিল। এই বিরোধের ফলে টাটা ট্রাস্টস ও টাটা সন্সের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। ট্রাস্টিদের মধ্যেও বিভাজনের খবর সামনে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে অমিত শাহের বাসভবনে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
নির্মলা সীতারামনের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। প্রমাণ ছাড়া কোনও বাণিজ্যিক বিরোধকে অপরাধ বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়। রাহুলের মতো একজন দায়িত্বশীল বিরোধী নেতার কাছ থেকে তথ্যনির্ভর অভিযোগই প্রত্যাশিত। কিন্তু একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকেও প্রত্যাশা ছিল, তিনি রাহুলের উত্থাপিত নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলির উত্তর দেবেন। তার পরিবর্তে কংগ্রেসের অতীত, রাহুলের রাজনৈতিক আচরণ এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে পাল্টা আক্রমণ বিতর্কের মূল বিষয়টিকে কিছুটা আড়াল করেছে।
বস্তুত, রাহুলের অভিযোগ সত্য কি না, তা তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু টাটা গোষ্ঠীর মতো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সরকারের উচিত সেই ব্যাখ্যা দেওয়া, অভিযোগকারীকে
শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে চিহ্নিত করা নয়।
ভারতের শিল্পপতিদের স্বাধীনতা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত দেশের অর্থনৈতিক গণতন্ত্র। ব্যবসায়ীরা যদি মনে করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরাগভাজন হলে তাঁদের ব্যবসা বিপন্ন হতে পারে, তাহলে সুস্থ বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে না। আবার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সুবাদে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পেলে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত্তিও দুর্বল হবে।
রাহুল গান্ধীর অভিযোগ এবং নির্মলা সীতারামনের পাল্টা আক্রমণ— দুটির মধ্যেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক তরজার বাইরে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। টাটা গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কে? ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের কোনও ভূমিকা আছে কি? আর থাকলে তার প্রকৃতি কী?
অর্থমন্ত্রী যতই রাহুলকে আক্রমণ করুন, বিরোধী নেতার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সরকারের এড়ানোর উপায় নেই। একইভাবে রাহুলকেও তাঁর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ হাজির করতে হবে। কারণ, ভারতের শিল্পজগৎ কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, কোনও বিশেষ শিল্পপতি গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যও নয়। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিল্পের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের উপর। রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধ নয়, এই তিনটি বিষয়ের নিশ্চয়তাই এখন দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।




