• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 30 October, 2026

আঠারো বছরের অপেক্ষার অবসান: রাজ্যে দ্বিতীয় এইমস পাচ্ছে রায়গঞ্জ, ২০০ একর জমি চিহ্নিত করে কেন্দ্রকে চিঠি নবান্নের

দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান। উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জে রাজ্যের দ্বিতীয় এইমস তৈরির উদ্যোগ। ২০০ একর নিষ্কণ্টক সরকারি জমি চিহ্নিত করে কেন্দ্রকে চিঠি দিল নবান্ন।

আঠারো বছরের অপেক্ষার অবসান: রাজ্যে দ্বিতীয় এইমস পাচ্ছে রায়গঞ্জ, ২০০ একর জমি চিহ্নিত করে কেন্দ্রকে চিঠি নবান্নের

Artist's impression of AIIMS, Gorakhpur (Image: Indesign Sudio)

দীর্ঘ ১৮ বছরের বঞ্চনা, টালবাহানা এবং আক্ষেপের পর অবশেষে উত্তরবঙ্গের মাটিতে বিশ্বমানের স্বাস্থ্য পরিষেবার স্বপ্ন ডানা মেলতে চলেছে। কল্যাণীর পর রাজ্যের দ্বিতীয় অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস গড়ে উঠতে চলেছে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে। গত বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জের প্রশাসনিক সভা থেকে এইমস তৈরির এই মেগা প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই তৎপর হয়েছে প্রশাসন। নবান্নের তরফে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল প্রস্তাবিত এইমসের অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রককে চিঠি দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হল, এইমসের জন্য রায়গঞ্জের কাছেই প্রায় ২০০ একর উপযুক্ত জমিও চিহ্নিত করে ফেলেছে রাজ্য সরকার।

রায়গঞ্জে এইমস গড়ার দাবি আজকের নয়। ২০০৮ সালে তৎকালীন ইউপিএ সরকারের আমলে তদানীন্তন কংগ্রেস সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রয়াত প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির উদ্যোগেই প্রথম রায়গঞ্জে এইমস তৈরির ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল। জমিও দেখা হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের জট এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে বাম আমলে সেই প্রকল্প একচুলও এগোয়নি। পরবর্তীতে রাজ্যে পালাবদল হলেও তৃণমূল সরকারের আমলে এইমস নিয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়। উত্তরবঙ্গের মানুষের আক্ষেপ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের সদিচ্ছার অভাবেই রায়গঞ্জের হাতছাড়া হয়ে এইমস চলে যায় নদিয়ার কল্যাণীতে।

তবে সাম্প্রতিক বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে বিজেপির অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল রায়গঞ্জে এইমস ফিরিয়ে আনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের অন্দরেও এইমস নিয়ে একটা নীরব দড়ি টানাটানি ছিল। অনেক প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীই চেয়েছিলেন নিজেদের এলাকায় এই মেগা প্রজেক্ট নিয়ে যেতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শিকে ছিঁড়ল রায়গঞ্জের ভাগ্যেই।

কল্যাণীতে ইতিমধ্যেই একটি এইমস পুরোদমে চালু রয়েছে। তাই অনেকের মনেই প্রশ্নের বু্দ্বুদ, এক রাজ্যে কি জোড়া এইমস হওয়া সম্ভব? তথ্যানুসন্ধান বলছে, দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে একাধিক এইমস থাকার নজির ইতিমধ্যেই রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরপ্রদেশে দু’টি এইমস রয়েছে। একটি রায়বেরিলিতে এবং দ্বিতীয়টি গোরক্ষপুরে। বিহারেও পাটনার পাশাপাশি দ্বারভাঙায় দ্বিতীয় এইমস তৈরি হচ্ছে। একইভাবে জম্মু ও কাশ্মীরেও জোড়া এইমস রয়েছে। প্রথমটি বিজয়পুরে, দ্বিতীয়টি অবন্তীপোরায়। তবে বাংলার মতো জনবহুল এবং ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের দূরত্বের কথা মাথায় রাখলে, দ্বিতীয় এইমস আক্ষরিক অর্থেই সময়ের দাবি ছিল।

২০০৮ সালে রায়গঞ্জে এইমস না হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল জমি অধিগ্রহণের চাপ। সেই সময় যে জমি বাছা হয়েছিল তার সিংহভাগই ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং কৃষিজমি। এবার সেই ত্রুটি শুধরে নিয়েছে প্রশাসন। রায়গঞ্জের বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, এবার ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বদলে দ্বীপনগর এলাকার কাছে প্রায় ২০০ একর নিষ্কণ্টক সরকারি জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন জমি অধিগ্রহণের বিপুল খরচ বাঁচবে, তেমনই কৃষকদের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে এবং আইনি জটিলতার কোনও আশঙ্কা থাকছে না।

রায়গঞ্জে এইমস তৈরির এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের পুরো কৃতিত্বই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে দিচ্ছেন বিধায়ক কৌশিক চৌধুরী। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, তাঁদের সহযোগিতা এবং আশীর্বাদ ছাড়া এই দীর্ঘ লড়াই জেতা সম্ভব ছিল না। পাশাপাশি সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পালের অবদানও অনস্বীকার্য।

কৌশিকবাবুর সংযোজন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করেছি ঠিকই, তবে এই জয় উত্তর দিনাজপুরের সমস্ত বিধায়কদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। রায়গঞ্জের সাধারণ মানুষও বারবার আমাদের কাছে এই দাবি জানিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে এইমস শুধু একটি হাসপাতাল নয়, এটি একটি আবেগ।

রায়গঞ্জ থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার পথে এই বিশাল স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শুধু উত্তরবঙ্গের আটটি জেলাই নয়, লাগোয়া উত্তর বিহার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশের মানুষ উপকৃত হবেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য আর কলকাতায় দৌড়তে হবে না। বাঁচবে সময় ও অর্থ। একইসঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা এবং গবেষণার এক নতুন হাব হয়ে উঠবে এই অঞ্চল।

তবে আপাতত বল রয়েছে কেন্দ্রের কোর্টে। নবান্ন চিঠি দিলেও, কেন্দ্রের প্রতিনিধি দল এসে চিহ্নিত জমি পরিদর্শন করবে এবং উপযুক্ততা যাচাই করবে। সেই অনুমোদন মেলার পরেই শুরু হবে নির্মাণকাজ। তবে আঠারো বছরের খরা কাটিয়ে রায়গঞ্জের আকাশে এখন যে আক্ষরিক অর্থেই আশার আলোর রোশনাই, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।