• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 12 September, 2026

বাল্যবিবাহ রোধে রাজ্যের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ

জন্মনিবন্ধন ও বয়সের সরকারি নথি শক্তিশালী করা। চতুর্থত, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভবতী বা মায়ের তথ্য পাওয়া গেলে শিশু সুরক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা। পঞ্চমত, পুরোহিত, কাজি, বিবাহ-আয়োজক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা।

বাল্যবিবাহ রোধে রাজ্যের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ

File Photo

একটি মেয়ের হাতে যখন থাকার কথা বই, খাতা ও কিছু স্বপ্ন; তখন তার হাতে যদি তুলে দেওয়া হয় বিয়ের শাঁখা-পলা, তবে শুধু একটি শৈশবই শেষ হয় না— শেষ হয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতেরও বড় অংশ। বাল্যবিবাহ তাই নিছক একটি সামাজিক প্রথা নয়; এটি শিশুর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার বিরুদ্ধে এক গভীর সামাজিক অপরাধ। এই বাস্তবতার মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার ২০২৬ সালে বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক নজরদারির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ৭ সেপ্টেম্বর নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ঘোষণা করেন, রাজ্যজুড়ে বাল্যবিবাহ শনাক্ত করতে দোরে দোরে অভিযান চালানো হবে এবং আইন ভাঙলে গ্রেফতার, মামলা ও কারাদণ্ডের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভারতে প্রোহিবিশন অফ চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট, ২০০৬ অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহ একটি বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ৬০,০০০ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ইনস্টিটিউশনাল ডেলিভারি নথিভুক্ত হয়েছে। শুধু বিয়ে বন্ধ করলেই হবে না। বাল্যবিবাহের আগে, বিয়ের সময় এবং তার পরবর্তী ঝুঁকির প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন।

বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল বাড়ি বাড়ি গিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ে ও সংশ্লিষ্ট ঘটনা শনাক্ত করা। এর তাৎপর্য অত্যন্ত বড়। কারণ গ্রামবাংলার বহু ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ প্রকাশ্যে ঘোষণা করে হয় না। পরিবারের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা স্থানীয় কিছু মানুষ জানলেও প্রশাসনের কাছে খবর পৌঁছায় না। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে কিংবা মেয়েটি গর্ভবতী হওয়ার পরে ঘটনাটি সামনে আসে। বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহের ফলে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার, অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী এবং সন্দেহজনক বিয়ের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগেভাগে জানতে পারবে—এমনটাই সরকারের পরিকল্পনা। এখানে প্রশাসনের ভূমিকা হবে ঘটনা ঘটার পরে শাস্তি দেওয়া নয়, ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা। বর্তমান সরকারের ঘোষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল যে শুধু নাবালিকাকে বিয়ে করা পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, বাল্যবিবাহে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। বাল্যবিবাহের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে নিজের ভূমিকার জন্য জবাব দিতে হবে।

সরকারের নতুন ব্যবস্থায় অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হয়েছে বলে সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট স্বামীকে শোকজ নোটিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ বয়সের নথি বাল্যবিবাহ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মনিবন্ধন, স্কুলের নথি ও অন্যান্য সরকারি নথির মাধ্যমে বয়স যাচাই করা গেলে ‘বয়স কমিয়ে বা বাড়িয়ে’ বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।

বর্তমান সরকার বাল্যবিবাহের সঙ্গে প্রোটেকশন অফ চিল্ড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্স বা পকসো আইনের প্রাসঙ্গিক ধারাগুলিও কঠোরভাবে প্রয়োগ করার কথা বলেছে। ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পকসো আইনের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা রয়েছে-অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে বিয়ের নামে যৌন সম্পর্ককে সামাজিক রীতির আড়ালে বৈধতা দেওয়া যাবে না। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তদন্ত, বয়স নির্ধারণ, প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সরকারের ঘোষণায় বাল্যবিবাহে যুক্ত পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা প্রত্যাহার বা বন্ধ করার কথাও বলা হয়েছে। এটি সরকারের নীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ শুধু ফৌজদারি মামলা নয়, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সুবিধার ক্ষেত্রেও আইনভঙ্গের পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। তবে এই ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা প্রয়োজন। কোনও শিশুর খাদ্য, শিক্ষা বা মৌলিক অধিকার যেন শাস্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়— এই ভারসাম্য রক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আগের সরকারের কন্যাশ্রী প্রকল্পের মূল ধারণা ছিল, মেয়েদের স্কুলে রাখা এবং ১৮ বছর পর্যন্ত বিয়ে ঠেকাতে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কন্যাশ্রীর অনন্য উপভোক্তার সংখ্যা ৯২ লক্ষ ৯২,৮১৬। বর্তমান সরকার কন্যাশ্রীকে ‘কন্যারত্ন’ নামে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট ‘কন্যারত্ন দিবস’-এর অনুষ্ঠানে সরকার ১০ লক্ষেরও বেশি ছাত্রীকে কন্যারত্ন শিক্ষা অনুদান দেওয়ার উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। একই অনুষ্ঠানে নারীদের নিরাপত্তার জন্য ১৮১ হেল্পলাইন এবং কর্মজীবী মায়েদের সহায়তার জন্য ‘পালনা’ ক্রেশ উদ্যোগও চালু করা হয়। অর্থাৎ সরকারের নতুন পদ্ধতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে শুধু বাল্যবিবাহ বন্ধ করা নয়, মেয়েদের শিক্ষা ও নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করাও প্রতিরোধের অংশ।

বাল্যবিবাহের সঙ্গে স্কুলছুটের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একটি মেয়ে যত বেশি সময় বিদ্যালয়ে থাকে, তার সামনে তত বেশি বিকল্প তৈরি হয়। উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা, চাকরি ও আত্মনির্ভরতার সুযোগ বাড়ে। তাই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের কঠোর নীতির সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষায় ধরে রাখার কর্মসূচি যুক্ত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তথ্যভিত্তিক প্রশাসন।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অপ্রাপ্তবয়স্ক মায়েদের ইনস্টিটিউশনাল ডেলিভারির যে বিপুল সংখ্যা সামনে এসেছে, তা প্রশাসনের কাছে একটি ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যখন কোনও অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভবতী বা মা শনাক্ত হচ্ছেন, তখন সেই তথ্য থেকে সম্ভাব্য বাল্যবিবাহের ঘটনাও খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে জন্মনিবন্ধন, স্কুলের উপস্থিতি, স্কুলছুট, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য এবং বিবাহের নথি-এই সমস্ত তথ্যের সমন্বিত ব্যবহার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে কঠোর ঘোষণা করলেই বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে যাবে না। পশ্চিমবঙ্গে সমস্যাটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিকড় গভীর। দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ, স্কুলছুট, অশিক্ষা এবং প্রচলিত মানসিকতা এই সব কিছু মিলেই একটি পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই গ্রেফতার ও মামলা যেমন দরকার, তেমনই দরকার সচেতনতা, শিক্ষা, পুষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান।

সরকারের কঠোর নীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাপতে হবে একটি প্রশ্নে— বিয়ের পরে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হল, তা দিয়ে নয়; বিয়ের আগেই কতজন কিশোরীর বিয়ে আটকানো গেল, তা দিয়ে। পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর লড়াইয়ের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ— প্রথমত, প্রতিটি পঞ্চায়েত ও পুরসভা এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরীদের তালিকা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, স্কুলছুট মেয়েদের দ্রুত শনাক্ত করে পুনরায় শিক্ষা বা দক্ষতা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা। তৃতীয়ত, জন্মনিবন্ধন ও বয়সের সরকারি নথি শক্তিশালী করা। চতুর্থত, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভবতী বা মায়ের তথ্য পাওয়া গেলে শিশু সুরক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা। পঞ্চমত, পুরোহিত, কাজি, বিবাহ-আয়োজক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা। ষষ্ঠত, কন্যারত্নের মতো শিক্ষা-কেন্দ্রিক আর্থিক সহায়তাকে আরও বিস্তৃত করা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— কঠোর আইন এবং সামাজিক সহায়তা এই দুই হাতেই লড়তে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের বাল্যবিবাহ বিরোধী নতুন লড়াইয়ের সার্থকতা তখনই, যখন হাসপাতালের নথিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মায়ের সংখ্যা শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসবে, কোনও পঞ্চায়েতে গোপনে বাল্যবিবাহের আয়োজন হবে না এবং কোনও বাবা-মাকে বলতে হবে না— ‘মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতেই হবে।’