মানচিত্রকে আমরা সাধারণত পৃথিবীকে বোঝার একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম বলেই মনে করি। কোথায় কোন দেশ, কত বড় তার ভূখণ্ড, কোন মহাদেশ কোথায়— এসব জানার জন্য ছোটবেলা থেকেই আমরা মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু মানচিত্র কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। পৃথিবীর বাস্তব ভূগোলকে কাগজে বা পর্দায় তুলে ধরতে গিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। আর সেই সিদ্ধান্তের মধ্যে কখনও কখনও রাজনীতি, ইতিহাস এবং ক্ষমতার সম্পর্কও ঢুকে পড়ে।
সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘের একটি উদ্যোগ সেই পুরনো ধারণাকেই নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ১৫৬৯ সালে তৈরি মার্কেটর প্রজেকশন বহু শতাব্দী ধরে পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির অন্যতম প্রচলিত পদ্ধতি। কিন্তু এই পদ্ধতিতে মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলি বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আয়তন চোখে অস্বাভাবিকভাবে বড় মনে হয়, আর আফ্রিকা ও নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলি তুলনামূলকভাবে ছোট দেখায়।
বিষয়টি শুধু চোখের ভুল বা গণিতের সীমাবদ্ধতা নয়। একটি দেশকে আমরা মানচিত্রে যত বড় দেখি, অজান্তেই তার গুরুত্ব সম্পর্কেও একটি ধারণা তৈরি হয়। পৃথিবীর অর্থনীতি, জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের সামগ্রিক ধারণার উপরও মানচিত্রের প্রভাব থাকতে পারে। এই কারণেই আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনে টোগোর উদ্যোগটি তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের বক্তব্যের মধ্যে ছিল ঔপনিবেশিক যুগ থেকে চলে আসা এক ধরনের মানসিক কাঠামো বদলের দাবি।
জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবে ১৬৪টি দেশ সমর্থন জানিয়েছে, বিপরীতে ছিল শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইকুয়্যাল আর্থ প্রজেকশন-এর মতো নতুন পদ্ধতি পৃথিবীর দেশগুলির প্রকৃত আয়তনের তুলনামূলকভাবে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ছবি দিতে পারে। তবে এখানেই প্রশ্ন শেষ হয় না।
কারণ মানচিত্রের শুদ্ধতা শুধু আয়তনের সঠিক হিসাবের বিষয় নয়, সীমান্তের সঠিক উপস্থাপনাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই জায়গাতেই ভারতের আপত্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও মানচিত্রে অরুণাচল প্রদেশ বা আকসাই চিনকে ভারতের বাইরে আলাদা অঞ্চল হিসেবে দেখানো হলে, কিংবা জম্মু ও কাশ্মীর ও লাদাখকে ভারতের সরকারি অবস্থানের সঙ্গে অসঙ্গতভাবে উপস্থাপন করা হলে, সেটি নিছক কার্টোগ্রাফির বিষয় থাকে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
একই কথা প্রযোজ্য ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ভূখণ্ডকে কীভাবে মানচিত্রে দেখানো হবে, সেটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। তাই জাতিসঙ্ঘ যদি নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পথে এগোয়, তাকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। পৃথিবীর দেশগুলির প্রকৃত আয়তনকে তুলনামূলকভাবে ন্যায্যভাবে দেখানো যেমন জরুরি, তেমনই বিতর্কিত ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে কোনও পক্ষের দাবি যেন জাতিসঙ্ঘের মানচিত্রের মাধ্যমে স্বীকৃতি না পায়, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার।
এখানে একটি নীতিগত বিভাজন স্পষ্ট থাকা উচিত— মানচিত্রের প্রজেকশন পরিবর্তন এক বিষয়, আর কোনও ভূখণ্ডের মালিকানা স্বীকার করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। বিতর্কিত সীমান্তকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে তার পাশে আইনি অবস্থান সম্পর্কে নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
মানচিত্র পৃথিবীর ছবি আঁকে, কিন্তু সেই ছবি মানুষের পৃথিবী-ভাবনাকেও প্রভাবিত করে। তাই মানচিত্রে কোনও দেশকে অযথা বড় বা ছোট দেখানো যেমন অন্যায়, তেমনই বিতর্কিত সীমান্তকে একতরফাভাবে চূড়ান্ত বলে দেখানোও বিপজ্জনক। জাতিসঙ্ঘের সামনে এখন সুযোগ এসেছে— পৃথিবীকে শুধু নতুনভাবে আঁকার নয়, আরও ন্যায্য ও সতর্কভাবে তুলে ধরার। সেই কাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানই হওয়া উচিত প্রধান ভিত্তি।




