কিশোরী বয়সে বিয়ে এবং নাবালিকার সন্তান প্রসব কোনও স্বাভাবিক সামাজিক ঘটনা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সমস্যার প্রকাশ। তাই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক স্তরে আরও কঠোর এবং সমন্বিত পদক্ষেপের যে বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে স্বাগত। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজ্যে ১২ হাজার ৮৪৭টি কিশোরী বয়সে সন্তান প্রসবের ঘটনা চিহ্নিত হওয়ার পর এই সমস্যাকে আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা বলে দেখার অবকাশ নেই। সংখ্যাটি প্রশাসন ও সমাজ— উভয়ের
কাছেই সতর্কবার্তা।
বাল্যবিবাহের সঙ্গে শুধু একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে জড়িত থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ, আত্মনির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা। অল্প বয়সে মাতৃত্ব তার শরীরের উপরও গুরুতর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আসলে কেবল একটি আইন প্রয়োগের বিষয় নয়— এটি কিশোরীদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।
এই দিক থেকে স্বাস্থ্য দপ্তর ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কোনও নাবালিকা হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে এলে তার বয়স ও বিবাহের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা থাকলে এমন বহু ঘটনা সামনে আসতে পারে, যা অন্যথায় প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যায়। আধার, জন্মের শংসাপত্র, স্কুলের নথি ইত্যাদি যাচাই করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বয়স গোপন করে বিয়ে দেওয়া বাল্যবিবাহের একটি প্রচলিত কৌশল হলে নথিভিত্তিক যাচাই সেই ফাঁক অনেকটাই বন্ধ করতে পারে।
তবে প্রশাসনিক অভিযানকে সফল করতে হলে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি— বাল্যবিবাহের শিকড় কেবল আইন অমান্য করার প্রবণতায় নয়; দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং বহু পুরনো সামাজিক মানসিকতার মধ্যেও নিহিত। গ্রামীণ এলাকায় এই ধরনের ঘটনা বেশি হওয়ার তথ্য তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। শুধু বিয়ে বন্ধ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, সংশ্লিষ্ট কিশোরীর পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সে যাতে নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থাও করতে হবে।
আর একটি ইতিবাচক দিক হল, বাল্যবিবাহের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দায় নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বর বা কনের পরিবার ছাড়াও পুরোহিত, কাজি কিংবা অন্য সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, এই অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতাও গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠলেই যেন নির্বিচারে কাউকে অপরাধী না বানিয়ে যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়— এই ভারসাম্যও বজায় রাখা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সামাজিক সহযোগিতা। প্রশাসন যতই সক্রিয় হোক, প্রতিবেশী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, পঞ্চায়েত, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং পরিবারের সচেতনতা ছাড়া বাল্যবিবাহের সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব নয়। স্কুলছুট কিশোরীদের তালিকা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি সমন্বিত করা গেলে আগাম বিপদের সংকেত পাওয়া সম্ভব।
অতএব, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানকে কেবল শাস্তিমূলক অভিযান হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর সামাজিক সংস্কার কর্মসূচিতে পরিণত করা দরকার। আইন হবে প্রতিরোধের শক্তি, প্রশাসন হবে রক্ষাকবচ, আর শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ। একটি কিশোরীর শৈশব এবং ভবিষ্যৎ রক্ষা করা মানে আসলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করে তোলা।




