‘উত্তম অবাধে চলে অধমের সাথে,
তিনিই সৌমিত্র, যিনি থাকেন তফাতে’
কলেজের ডিবেট থেকে বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা—উত্তম কুমার (Uttam Kumar) না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়( Soumitra Chatterjee), কে বড় অভিনেতা, কে বেশি জনপ্রিয়, কে বেশি ‘অভিনেতা’—এই চিরন্তন বাঙালি তর্কে মজা করে হলেও ছড়াটা শোনা যেত। একদিকে আপামর বাঙালির স্বপ্নের নায়ক। অন্যদিকে ‘বুদ্ধিজীবী’ বাঙালির প্রিয় অভিনেতা। একজন ম্যাটিনি আইডল, অন্যজন ‘থিংকিং ম্যানস হিরো’।
কিন্তু মজার ব্যাপার হল, একসময় উত্তম কুমার নিজেই সেই ‘অধম’-এর সঙ্গে চলতে চাননি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, সেই ‘অধম’-এর চরিত্রে অভিনয় করতে চাননি। সেই অধম আর কেউ নন—রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’-র ‘সন্দীপ’। সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) যখন ঘরে বাইরে করার কথা ভাবছেন, তাঁর চোখে ‘সন্দীপ’ হিসেবে ছিলেন উত্তম কুমার (Uttam Kumar)।
চরিত্রটির আকর্ষণ আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, বাগ্মিতা আছে। কিন্তু সেই আকর্ষণের আড়ালে আছে আত্মকেন্দ্রিকতা, সুযোগসন্ধান এবং নিজের স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যবহার করার প্রবণতা।অর্থাৎ, দেখতে নায়কের মতো হলেও মানুষটি নায়ক নন। অপরাজিত-র শুটিংয়ের সময় অসুস্থ সত্যজিৎ রায়কে (Satyajit Ray) দেখতে গিয়েছিলেন উত্তম (Uttam Kumar)। সেই সময়ই পরিচালক তাঁকে ‘সন্দীপ’-এর চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। উত্তম (Uttam Kumar) রাজি হননি।কিন্তু গল্পে এখানেই প্রথম মোচড়।
অভিনয় করতে না চাইলেও ছবিটি প্রযোজনা করার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল—এমন উল্লেখ পরবর্তী স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়। তাঁর ‘আলোছায়া’ প্রোডাকশন্সের মাধ্যমে ‘ঘরে বাইরে’ প্রযোজনার প্রস্তাবও নাকি দিয়েছিলেন তিনি।সময়টা ১৯৫৬ নাগাদ। আর এই উত্তম কুমারকে (Uttam Kumar) বুঝতে গেলে আমাদের আরও আট বছর পিছিয়ে যেতে হবে।
আরও পড়ুন: দশ হাতে অস্ত্র, অথচ অসুর চিনতে এত ভয়!
১৯৪৮। নাম তখন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। দৃষ্টিদান দিয়ে অভিনয় জীবনে প্রবেশ। কিন্তু সেই প্রবেশের সঙ্গে সাফল্যের কোনও সম্পর্ক ছিল না। বরং শুরুটা ছিল ব্যর্থতা দিয়ে। একটার পর একটা ছবি। একটার পর একটা হতাশা। নাম বদলালেন, চরিত্র বদলালেন, ব্যর্থতা বদলাল না। এমন একটা সময় এল, যখন স্টুডিওপাড়ায় তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গেল নির্মম এক তকমা—‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’।
আজকের উত্তম কুমারকে (Uttam Kumar) কল্পনা করলে কথাটা অবিশ্বাস্য লাগে। কিন্তু তখন সত্যিই এমন একটা সময় ছিল, যখন উত্তমকে (Uttam Kumar) নিয়ে হাসাহাসি হত। কাজ পাওয়া কঠিন। নিজের জায়গা তৈরি করা আরও কঠিন। পর্দায় নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছেলেটিকে বাস্তবের স্টুডিওপাড়া বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—তুমি এখনও কেউ নও।
তখন সিনেমা তাঁর একমাত্র ভরসাও নয়। ‘কলকাতা পোর্ট কমিশনার্স’ অফিসে চাকরি করতে হচ্ছে। দিনের একদিকে চাকরি, অন্যদিকে স্টুডিও। সন্ধ্যা নামলেই সিনেমার দরজায় কড়া নাড়া। আজ কাজ মিলবে কি না, আগামী ছবিটা চলবে কি না—কিছুই নিশ্চিত নয়। কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত ছিল।লোকটা হাল ছাড়ছেন না।

নিজের অভিনয় নিয়ে কাজ করতে থাকলেন তিনি। উচ্চারণ, শরীরী ভাষা, ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক থাকা—সবকিছু নিয়ে নিজেকে তৈরি করতে থাকলেন। যে জড়তা একদিন তাঁকে পিছিয়ে দিচ্ছিল, সেটাকেই ধীরে ধীরে জয় করলেন। অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভিতরে তখন জন্ম নিচ্ছে উত্তম কুমার (Uttam Kumar)।
১৯৫২-তে ‘বসু পরিবার’। এবার যেন ভাগ্যের দরজায় প্রথম ফাঁক। তার পর ১৯৫৩—’সাড়ে চুয়াত্তর’। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে সেই জুটি, যা বাংলা ছবির ইতিহাসই বদলে দিল।তারপর ‘অগ্নিপরীক্ষা’। ‘সাগরিকা’। ‘শাপমোচন’। একসময়ের ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ হয়ে উঠলেন বাংলা ছবির সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। মাত্র আট বছর।
১৯৪৮-এর অরুণ থেকে ১৯৫৬-এর উত্তম (Uttam Kumar)। এটাই সেই উত্তম, যাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)। আর সেই উত্তমই সন্দীপ হতে চাইলেন না।কী আশ্চর্য—সত্যজিৎ(Satyajit Ray) যাঁর মধ্যে’ সন্দীপ’কে দেখতে পাচ্ছেন, তিনি নিজেই হয়তো বুঝেছিলেন, তাঁর তৈরি নায়ক-ইমেজের ভিতর সেই চরিত্রকে গ্রহণ করা সহজ হবে না।
‘
কিন্তু ইতিহাসের আরও বড় রসিকতা তখনও বাকি। ‘সন্দীপ হতে না-চাওয়া উত্তম কুমারই (Uttam Kumar) কয়েক বছর পরে সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) ‘নায়ক’-এ এমন একটি চরিত্র করলেন, যেখানে তাঁকে নিজের তারকা-সত্তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হল।’ অরিন্দম মুখার্জি’। একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা। বাইরে আত্মবিশ্বাস। ভিতরে সংশয়। বাইরে সাফল্য। ভিতরে ভয়। বাইরে হাজার মানুষের ভালোবাসা। ভিতরে একা একজন মানুষ। নায়ক যেন উত্তম কুমারের (Uttam Kumar) তারকা-জীবনের ভিতরেই সত্যজিতের ক্যামেরা ঢুকিয়ে দিল।
আর শুটিংয়ের শুরুতেই ঘটে গেল সেই মেকআপের ঘটনা। নায়ক করার কিছুদিন আগেই উত্তম কুমার (Uttam Kumar) চিকেনপক্সে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মুখে তার দাগ রয়ে গিয়েছিল। নিজের চেহারা নিয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। তার ওপর প্রথম দিনের প্রথম শটেই সত্যজিৎ (Satyajit Ray) জানিয়ে দিলেন—মেকআপ হবে না। উত্তমের (Uttam Kumar) স্বাভাবিকভাবেই আপত্তি ছিল। মহানায়কের মুখে মেকআপ থাকবে না? কিন্তু সত্যজিৎ (Satyajit Ray) জানতেন তিনি কী করছেন। তিনি উত্তমকে আশ্বস্ত করলেন—প্রথমে মেকআপ ছাড়া একটা শট নেওয়া হোক। ভালো না লাগলে পরে মেকআপ নেওয়া যাবে।
উত্তম রাজি হলেন। ক্যামেরা চলল। শট হল। তারপর রাশ দেখানো হল। আর সেখানেই বদলে গেল উত্তমের মন। নিজেকে পর্দায় দেখে তিনি মুগ্ধ। মেকআপ ছাড়াই এত ভালো লাগছে! মুখের দাগও আলো-ছায়ার খেলায় যেন আর তেমন চোখে পড়ছে না। সন্দেহটা কেটে গেল। সত্যজিৎ যেন তাঁর মুখ থেকে মেকআপ সরিয়ে শুধু মুখটাই দেখাননি—তারকার মুখোশটাও একটু সরিয়ে দিয়েছিলেন। আর সেই মুখের আড়ালে যে অভিনেতা, নায়ক তাঁকেই সামনে নিয়ে এল।
ট্রেনের কামরায় শর্মিলা ঠাকুরের (Sharmila Tagore) সঙ্গে কথোপকথন। সাংবাদিকের সামনে তারকার আচরণ। পুরনো স্মৃতির মুখোমুখি হওয়া। স্বপ্নের ভিতরে ঢুকে যাওয়া। অপরাধবোধ, ভয়, আত্মপ্রবঞ্চনা। উত্তম (Uttam Kumar)যেন নিজের তৈরি করা ইমেজের ভিতরে ঢুকে সেই ইমেজটাকেই খুলে ফেলছেন। অভিনেতা শুধু চরিত্র পড়ছেন না। পরিচালককেও পড়ছেন। নায়ক-এর শুটিং নিয়ে প্রচলিত একটি স্মৃতিচারণায় আছে, একটি দৃশ্যের শট ঠিকমতো হচ্ছিল না। সত্যজিৎ সন্তুষ্ট নন। পরিচালক টেনশনে। উত্তম কিছুটা সময় চাইলেন। ফিরে এসে দিলেন নিখুঁত শট। কী করে করলেন?
উত্তমের (Uttam Kumar) নাকি উত্তর ছিল—শট ঠিক না হওয়ায় পরিচালকের যে টেনশন, সেটাই তিনি নিজের চরিত্রের টেনশন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ঘটনাটি সত্য হোক বা শুটিং-স্মৃতির কিংবদন্তি—উত্তম কুমারের অভিনয়বোধ বোঝাতে এর চেয়ে সুন্দর গল্প আর কী হতে পারে? সত্যজিৎ পরে উত্তমের অভিনয় সম্পর্কে লিখেছিলেন, তিনি এমন অনেক ছোট ছোট আচরণ ক্যামেরায় ধরে ফেলতেন, যা পরিচালকের নির্দেশ নয়—উত্তমের নিজের আবিষ্কার; অথচ সবই চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেত।
আরও পড়ুন: বিশু পাগলেরা ফিরে ফিরে আসে
এই জুটির পরের অধ্যায় ‘চিড়িয়াখানা’। ‘ব্যোমকেশ বক্সীর’ চরিত্রে উত্তমকে (Uttam Kumar) দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে। তারপর উত্তম–সৌমিত্র দ্বৈরথের আরেক কিংবদন্তি—’ঝিন্দের বন্দী’। কিন্তু এখানে আগের ছড়াটাই যেন সিনেমার পর্দায় নতুন অর্থ পেল। ‘ময়ূরবাহন’ কে? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee)। আর উত্তম? তিনি এক চরিত্রে নয়, দ্বৈত চরিত্রে—’শঙ্কর সিং’ এবং ‘গৌরীশঙ্কর রায়’। অর্থাৎ, উত্তমের বিপরীতে সৌমিত্র ভিলেন। আর ‘ময়ূরবাহন’ হিসেবে সৌমিত্র এমন দাগ রেখে গেলেন যে অনেক দর্শকের কাছে সেই খলনায়কই ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে উত্তম নিজের স্টারডমকে আঁকড়ে পড়ে থাকেননি।
নায়ক হওয়ার সুবিধা তিনি জানতেন। কিন্তু নায়ক হওয়াকেই নিজের সীমা হতে দেননি। ‘বাঘবন্দি খেলা’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’—জীবনের শেষ পর্বেও তিনি চরিত্রের নতুন দরজা খুঁজেছেন। কখনও নায়ক, কখনও চরিত্রাভিনেতা, কখনও এমন মানুষ, যার ভিতরে আলো-অন্ধকার পাশাপাশি।
কারণ ততদিনে উত্তম কুমার জানেন— নায়ক হওয়া আর অভিনেতা হওয়া এক জিনিস নয়। নায়ক একটি চরিত্র। অভিনেতা একটি সম্ভাবনা।
আর উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি সেই সম্ভাবনাটাকে কোনও একটি চরিত্রের মধ্যে বন্দি হতে দেননি।
অরুণ থেকে উত্তম। উত্তম (Uttam Kumar)থেকে অরিন্দম মুখার্জি। অরিন্দম থেকে অন্য নানা চরিত্র। নায়ক থেকে অভিনেতা। তারকা থেকে কিংবদন্তি। তাই মৃত্যুর ছেচল্লিশ বছর পর, তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়েও উত্তম কুমার শুধু অতীতের রূপোলি পর্দার নায়ক নন। কিছু তারকা তাঁদের সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যান। উত্তম কুমার সময়ের সঙ্গে শেষ হননি। সময়ই বরং উত্তম কুমারের চারপাশে এসে থেমে গেছে। বাঙালির কাছে তিনি আজও ম্যাটিনি আইডল। আজও মহানায়ক। আর সেই প্রথম ছড়াটার দিকে ফিরে তাকালে তার অর্থটাও যেন বদলে যায়।
‘উত্তম অবাধে চলে অধমের সাথে…’ হয়তো এটাই শেষ কথা। কারণ উত্তম কুমারের (Uttam Kumar) আসল মহত্ত্ব শুধু তিনি কত বড় নায়ক ছিলেন, তাতে নয়। তিনি কত সহজে নায়কের সীমানা পেরোতে পেরেছিলেন, তার মধ্যে। সন্দীপ হননি। ময়ূরবাহনও হননি—সেটি সৌমিত্রর। কিন্তু নায়কোচিত ইমেজের নিরাপদ গণ্ডি ভেঙে, নিজের তারকা-সত্তাকে প্রশ্ন করে, ক্যামেরার সামনে বারবার নতুন করে দাঁড়ানোর সাহস—এই অবাধ চলাফেরাটাই তাঁকে আলাদা করে দেয়। তাই ছেচল্লিশ বছর পরেও তিনি শুধু স্মৃতি নন। শতবর্ষেও তিনি শুধু ইতিহাস নন। তিনি এখনও উত্তম। আর বাঙালির কাছে—মহানায়ক।
দেখুন: শতবর্ষে মহানায়ক উত্তমকুমার, স্মৃতির আবেশে মাতল টালিগঞ্জ
দেখুন: উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে নন্দনে ৩ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর বিশেষ অনুষ্ঠান




