• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 7 July, 2026

‘ওদের দলে মেসি আছে, আমাদেরও রয়েছে মহম্মদ সালাহ’- আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে হুঙ্কার মিশরের

সালাহর সামনে রয়েছে মিশরকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ, যেখানে দেশটি আগে কখনও পৌঁছতে পারেনি। তবে এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু দুই মহাতারকার একই মাঠে নামার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

‘ওদের দলে মেসি আছে, আমাদেরও রয়েছে মহম্মদ সালাহ’- আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে হুঙ্কার মিশরের

Photo: X

মঙ্গলবার রাতে (ভারতীয় সময়) আটলান্টায় বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ লড়াই। মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও মিশর। এই ম্যাচে একই মঞ্চে দেখা যাবে আধুনিক ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও মহম্মদ সালাহকে। একদিকে মেসি দৌড়চ্ছেন ইতিহাসে আরও এক নতুন অধ্যায় যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে, অন্যদিকে সালাহ চেষ্টা করবেন এমন এক কীর্তি গড়তে, যাকে অনেকেই প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন।

আটলান্টায় এই ম্যাচে ফুটবল বিশ্বের দুই বড় নাম একই মাঠে নামতে চলেছেন। টানা দ্বিতীয় বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথম বার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার উদ্দেশে লড়বে মিশর। ম্যাচের ফলের পাশাপাশি নজর থাকবে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও, যেখানে সঠিক দিনে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখাতে পারলে মেসির সামনে সবার ওপরে পৌঁছে যাওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে।

কাগজে-কলমে খুব একটা ভালো অবস্থায় যে নকআউট পর্বে পৌঁছেছে আর্জেন্টিনা, তা নয়। শেষ বত্রিশের ম্যাচে কেপ ভার্দেকে হারাতে তাদের অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১২০ মিনিটের ক্লান্তিকর লড়াইয়ের শেষে বোরহেসের আত্মঘাতী গোলে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। তবে সেই জয় যতটা না স্বস্তি দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে মেসিদের পারফরম্যান্স নিয়ে। তাই কোচ লিওনেল স্কালোনি জানেন, ধারাবাহিকভাবে ছন্দে থাকা মিশরের বিরুদ্ধে একই রকম খেললে চলবে না।

ম্যাচের আগে স্কালোনি বলেছেন, “কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে আমরা যেমন সতর্ক ছিলাম, এখনও ঠিক তেমনই সতর্ক রয়েছি। মিশরও খুব ভালো প্রতিপক্ষ। ওরা অত্যন্ত শক্তিশালী দল। দলে গুরুত্বপূর্ণ কয়েক জন ফুটবলার রয়েছে এবং এমন একজন কোচ আছেন, যিনি বেশ কিছু দিন ধরে দলের সঙ্গে কাজ করছেন। ওরা দারুণ ফুটবল খেলে এবং প্রতিপক্ষের জন্য সব সময়ই কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।”
ফিটনেসের নিয়েও স্বস্তির খবর রয়েছে আর্জেন্টিনা শিবিরে। স্কালোনি নিশ্চিত করেছেন, কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে দুই ঘণ্টার লড়াইয়ে পুরো ম্যাচ খেললেও শুরু থেকেই মাঠে নামার মতো সম্পূর্ণ ফিট রয়েছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার জন্য এটি বড় স্বস্তির, কারণ দলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন সেই মেসি-ই। শুধু ম্যাচের ফল নয়, তাঁর সামনে রয়েছে ব্যক্তিগত লক্ষ্যও।

সোনার বুটের দৌড়ে মেসি, কিলিয়ান এমবাপে এবং এরলিং হালান্ড— তিন জনেরই গোলসংখ্যা সাত। তবে অ্যাসিস্টের নিরিখে এমবাপে সাময়িকভাবে এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু এই ম্যাচে মেসি আরও একবার ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারলে ফের শীর্ষস্থান ফিরে পেতে পারেন। পাশাপাশি রয়েছে ইতিহাস গড়ার সুযোগও। বিশ্বকাপে নিজের কেরিয়ারে ইতিমধ্যেই ২০ গোল করে এমবাপের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছেন মেসি। প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে সেই রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগও পাচ্ছেন তিনি।

তবে মেসির সামনে রয়েছে আর এক বিশ্বতারকা, যার আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। মহম্মদ সালাহ এ বারের বিশ্বকাপে চার ম্যাচে মাত্র একটি গোল করেছেন, যা তাঁর মান অনুযায়ী খুবই সাধারণ পারফরম্যান্স। তবুও মিশরের আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি তিনিই। বর্তমানে কোনও ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ না থাকলেও তাতে তাঁর পারফরম্যান্সে কোনও প্রভাব পড়েনি। মিশর বিশ্বাস করে, সালাহর নেতৃত্বেই তারা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম বার কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছতে পারে।

সালাহকে নিয়ে স্কালোনিও যথেষ্ট সতর্ক। তিনি বলেছেন, “সালাহ একজন অসাধারণ ফুটবলার। ওর বিরুদ্ধে খেলতে পারাটা আনন্দের। আমাদের দল জানে, এই ধরনের বড় মাপের ফুটবলারদের বিরুদ্ধে কী ভাবে খেলতে হয়। আর সেই কারণেই আমরা সব সময় ওদের মোকাবিলার জন্য কঠোর পরিশ্রম করি।”

গত ম্যাচে তাঁর পেনাল্টি নিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সালাহ বলেছেন, “দলের অন্যদের তুলনায় আমার অভিজ্ঞতা বেশি। তাই ওদের আত্মবিশ্বাস জোগাতেই আমি সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম,” বলেছেন সালাহ। উল্লেখ্য, এর আগে মিশরের হয়ে শেষ দু’টি টাইব্রেকারেই তিনি পেনাল্টি মিস করেছিলেন। এর মধ্যে চার বছর আগে সেনেগালের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের প্লে-অফও রয়েছে। সালাহ আরও বলেছেন, “এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ কি না, আমি জানি না। কিন্তু এই দায়িত্ব আমাকে নিতেই হতো। সেই দিনটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা দিন ছিল।”

মেসি বনাম সালাহ দ্বৈরথ ঘিরে যতই উন্মাদনা থাকুক না কেন, এই ম্যাচকে শুধুমাত্র দুই তারকার ব্যক্তিগত লড়াই হিসেবে দেখাটা ভুল হবে। এ বারের বিশ্বকাপের অন্যতম চমকপ্রদ দল এই মিশর। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে নকআউটে ওঠার পর শেষ বত্রিশে অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে তারা।

টুর্নামেন্ট জুড়ে একের পর এক ম্যাচে চাপে পড়েও দৃঢ়তা দেখিয়েছে মিশরের রক্ষণভাগ। আর এখন তারা ইতিহাস গড়া থেকে মাত্র একটি জয় দূরে। কারণ, এর আগে কোনও মিশরীয় দল কখনও বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছতে পারেনি।

মিশরের কোচ হোসাম হাসান মনে করেন, প্রতিপক্ষের নাম বা মর্যাদা দেখে তাঁর দল ভীত নয়। তিনি বলেছেন, “প্রতিপক্ষের জার্সির রং কী, তাদের নাম কী, কিংবা তারা র‌্যাঙ্কিংয়ের কত নম্বরে রয়েছে— সেসব না ভেবেই আমরা নিজেদের প্রস্তুতি নিয়েছি। এটা বিশ্বকাপ। নিজেদের প্রমাণ করার এবং দেখিয়ে দেওয়ার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ যে, এই মঞ্চে খেলার যোগ্যতা আমাদের রয়েছে।”

FIFA World Cup 2026
Photo: X

মিশরের জাতীয় দলের ডিরেক্টর ইব্রাহিম হাসান অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাদের দলেও এমন একজন ফুটবলার রয়েছেন, যিনি লিভারপুলের হয়ে ২৫৭টি গোল করেছেন এবং চার বার প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট জিতেছেন। তাই তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকাকে ঘিরে বাড়তি ভাবনার কোনও কারণ নেই।

ইব্রাহিম হাসান বলেছেন, “আমরা মেসিকে নিয়ে আলাদা করে ভাবছি না। আমরা ফুটবলারদের বলেছি, মাঠে নেমে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে। প্রতিপক্ষে কারা রয়েছে বা তাদের কত বড় নাম— সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। ওদের দলে হয়তো মেসি রয়েছে, কিন্তু আমাদের দলে রয়েছে মহম্মদ সালাহ। আর আমাদের নিজেদেরও ২৬ জন ‘মেসি’ রয়েছে।”

আটলান্টায় দুই দল মাঠে নামার সময় ক্যামেরার প্রথম নজর পড়বে মেসি এবং সালাহর দিকেই। মেসির কাছে এটি গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার এবং বিশ্বকাপে তাঁর অবিশ্বাস্য কেরিয়ারে আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করার সুযোগ। আর সালাহর সামনে রয়েছে মিশরকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ, যেখানে দেশটি আগে কখনও পৌঁছতে পারেনি। তবে এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু দুই মহাতারকার একই মাঠে নামার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেই সঙ্গে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য এনে দেওয়ার হাতছানিও রয়েছে তাঁর সামনে।