• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 7 July, 2026

চোখের জলে বিশ্বকাপ-বিদায় রোনাল্ডোর, পর্তুগালের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন কোচ মার্তিনেজও

মঙ্গলবারও (ভারতীয় সময় অনুযায়ী) দেখা গেল ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকার কান্না। অতীতে মারাদোনাকেও একই ভাবে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করতে হয়েছে

চোখের জলে বিশ্বকাপ-বিদায় রোনাল্ডোর, পর্তুগালের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন কোচ মার্তিনেজও

Photo: Representational Image

ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কেরিয়ার শেষ হয়ে গেল সবচেয়ে বড় খেতাব ছাড়াই।পর্তুগালের হয়ে শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে ফেললেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। চলতি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে এক গোলে হার দিয়ে শেষ হল তাঁর বিশ্বকাপ সফর।

ডালাসে মিকেল মেরিনোর সংযুক্ত সময়ের গোলে তাদের প্রতিবেশী দেশ স্পেন কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা পাকা করে নেয়। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর দীর্ঘ যাত্রারও ইতি ঘটে। ম্যাচ শেষে চোখের জলের বাঁধ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। আগের রাতে আর এক ফুটবল কিংবদন্তি ব্রাজিলের নেইমারকেও চোখের জল ফেলে বিদায় নিতে দেখা গিয়েছে।

মঙ্গলবারও (ভারতীয় সময় অনুযায়ী) দেখা গেল ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকার কান্না। অতীতে মারাদোনাকেও একই ভাবে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করতে হয়েছে। ফুটবল এ রকমই, নির্দয়।পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী, পাঁচবারের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী এবং ইউরো ২০১৬-র চ্যাম্পিয়ন ৪১ বছর বয়সি রোনাল্ডো।

ক্লাব ও দেশের হয়ে তিনি ৯৭৬টি গোল করেছেন, যা এক নজির। বিশ্বরেকর্ড গড়ে টানা ছ’টি বিশ্বকাপে গোল করেছেন রোনাল্ডো। বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে কাছে পৌঁছেছিলেন ২০০৬-এ, নিজের প্রথম বিশ্বকাপে। সে বার সেমিফাইনালে উঠেছিল পর্তুগাল।বিশ্বকাপ শুরুর আগেই রোনাল্ডো ঘোষণা করেছিলেন, এটাই হবে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ।

তবে ম্যাচ শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি পরিবারের সঙ্গে কথা বলব এবং ঠাণ্ডা মাথায় সেই সিদ্ধান্ত নেব।’ ম্যাচ শেষে স্পোর্টটিভিকে রোনাল্ডো বলেন, ‘আমি ভালো আছি। তবে এভাবে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হওয়ায় অবশ্যই খারাপ লাগছে। কিন্তু গতকাল সাংবাদিক বৈঠকেও যেমন বলেছিলাম, আমি আমার সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি। তাই আমি সম্পূর্ণ পরিষ্কার বিবেক নিয়েই মাঠ ছাড়ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটাই একজন ফুটবলারের জীবন। কখনও আমরা জিতি, কখনও হারি। কিন্তু আমাদের এগিয়ে যেতেই হয়। সত্যিটা হল, এটাই ছিল আমার শেষ বিশ্বকাপ। এখন পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাব, যাতে আবেগের বশে কোনও সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’

রোনাল্ডো আরও বলেন, ‘আগামীকাল আমি সম্পূর্ণ পরিষ্কার বিবেক নিয়েই ঘুম থেকে উঠব। আমি পর্তুগালের হয়ে তিনটি খেতাব জিতেছি— একটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দুটি উয়েফা নেশনস লিগ। ক্রিশ্চিয়ানোর আগে পর্তুগাল কখনও কোথাও চ্যাম্পিয়ন হয়নি। তাই আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়েই বিদায় নিচ্ছি। আমি আমার সর্বস্ব দিয়েছি। আগামীকাল নতুন একটি দিন হবে, আর জীবন এগিয়ে চলবে।’

৪১ বছর বয়সি রোনাল্ডো প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন ২০০৬ সালে জার্মানিতে। সেই বিশ্বকাপেই ইরানের বিরুদ্ধে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেন তিনি এবং দীর্ঘ ৪০ বছর পর পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এরপর ২০১০-এ দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৪-য় ব্রাজিল, ২০১৮-য় রাশিয়া এবং ২০২২-এ কাতার বিশ্বকাপেও খেলেছেন। প্রতিটি আসরেই অন্তত একটি করে গোল করেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।

চলতি বিশ্বকাপে পর্তুগালের দ্বিতীয় ম্যাচেই ইতিহাস গড়েছিলেন রোনাল্ডো। উজবেকিস্তানের বক্সে অল্প একটু ফাঁকা জায়গা তৈরি করে সতীর্থের ক্রস থেকে নিজের চিরপরিচিত ফার্স্ট টাচে জোরালো শটে গোল করেন তিনি। সেই গোলের সুবাদেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ছ’টি বিশ্বকাপ আসরে গোল করার অনন্য নজির গড়েন পর্তুগিজ মহাতারকা।

সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে রোনাল্ডো খেলেছেন ২৭টি ম্যাচ, যা তাঁকে সর্বকালের সর্বাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রেখেছে। এই ২৭ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ১১। এই বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচেই আল-নাসরের তারকা রোনাল্ডোকে প্রথম একাদশে খেলানোর চাপ না থাকলে পর্তুগালের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা আরও বেশি থাকত কি না— সেই বিতর্কের উত্তর হয়তো আর কোনও দিন স্পষ্ট হবে না।

তবে স্পেনের কাছে হারলে যে পর্তুগালের কোচের পদ ছাড়ার ঘোষণা করবেন রবার্তো মার্তিনেজ, এর স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল এবং তিনি সেটাই করলেন। এ দিন বিদায়ী সাংবাদিক সম্মেলনে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে মার্তিনেজ বলেন, ‘বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্য নিয়েই আমি পর্তুগালে এসেছিলাম। আমার মনে হয়, সেই লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে আর এই দায়িত্বে থেকে যাওয়ার কোনও অর্থ নেই। এখন বোর্ড এবং সভাপতি নতুন কোচ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। আজই আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর বেশি বলার আর কিছু নেই।’

মার্তিনেজ জানান, বিশ্বকাপ শুরুর আগে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। কিন্তু আজ নিয়ে ফেলেছেন। বলেন, ‘হ্যাঁ, জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এটাই আমার শেষ ম্যাচ। আমি অত্যন্ত গর্বিত। পর্তুগালের মানুষ আমাকে তাঁদেরই একজন হিসেবে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। এই দলের দায়িত্ব পালন করা আমার কাছে ছিল আনন্দের, গর্বের এবং একই সঙ্গে এক বিশাল দায়িত্ব।’

রোনাল্ডোকে ‘ফুটবলের আইকন’ বলে উল্লেখ করে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেন পর্তুগালের বিদায়ী কোচ।মার্তিনেজ বলেন, ‘এই বিশ্বকাপে সে যা করার চেষ্টা করেছে, তার জন্য আমাদের তাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। এই বিশ্বকাপ জেতাই ছিল ওর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ও অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’ পর্তুগালের বিদায়ী কোচের কথায়, ‘রোনাল্ডো ফুটবলের এক অনন্য উদাহরণ। আর মাঠের সেই ফুটবলারের আড়ালে যে মানুষটি রয়েছে, সেও সকলের কাছে আদর্শ।’

২০২৩-এ পর্তুগালের দায়িত্ব নেন মার্তিনেজ। এই স্প্যানিশ কোচের অধীনে পর্তুগাল ২০২৪ উয়েফা ইউরোতে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। এ ছাড়া পরের বছর তাঁর নেতৃত্বেই উয়েফা নেশনস লিগের খেতাবও জেতে।