কার্যত একাই ব্রাজিলকে হারিয়ে দিলেন ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার এরলিং হালান্ড। ভারতীয় সময় অনযায়ী সোমবার মাঝরাতে দু-দুটি গোল করে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেন তিনি। ১৯৯০-এর পর থেকে এই প্রথম ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নিল। হার নরওয়ের কাছে। আর এত বড় জয়ের নায়ক যিনি, সেই হালান্ড যেন নির্বিকার।
নিজের একের পর এক মাইলফলক ছোঁয়া নিয়ে বরাবরের মতোই নির্বিকার ছিলেন তিনি। তাঁর মতে, গোল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হল মনোযোগ ধরে রাখা। ব্রাজিলকে ২-১-এ হারিয়ে উঠে হালান্ড সাংবাদিকদের বলেন, “আমার ক্ষেত্রে সাধারণত এমনটাই হয়। আমি যদি এক-দুটো সুযোগ পাই, সেগুলো সাধারণত গোলে পরিণত হয়। আমি কীভাবে এটা করি, সেটা আমি নিজেও জানি না, কিন্তু এভাবেই করি। সবকিছুই মনোযোগ ধরে রাখার ওপর নির্ভর করে। আমি নিজেকে বলি, সুযোগ আসবেই। এখন আমি বুঝতে শুরু করেছি, বলটা নিখুঁতভাবে জালে জড়িয়ে যাওয়াটা আসলে ঈশ্বরের দেওয়া এক উপহার। ব্যাপারটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছি। আমি আশা করি, এই সাক্ষাৎকারটি দেশের তরুণ-তরুণীরা যারা দেখছে, তারা যখন একটু বড় হবে, তখন বুঝবে যে নরওয়ের হয়ে খেলাই জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়। এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
হালান্ড বলেন, “আমার ইচ্ছে করছে এখনই রাস্তায় নেমে পড়ি। আমি চাই এই উদ্যাপনের মাঝখানেই থাকতে। আনন্দ করার সময় এটা। সবাইকে আনন্দ করতে হবে, গোটা নরওয়েকেই আনন্দ করতে হবে। আজকের দিনটা পাগল করে দেওয়ার মতো। নরওয়ের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে স্মরণীয় দিনগুলোর একটি। তাই এই মুহূর্তটা উপভোগ করাই আমাদের কাজ।”
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, যারা রেকর্ড ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল, তাদের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রায় নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছিল। কিন্তু নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ছোট্ট নরওয়েই সেই হিসাব উল্টে দেয়। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে মারাদোনার আর্জেন্টিনা কাছে হারের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিতে হল ব্রাজিলকে।
এই ঐতিহাসিক জয়ের পর, প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারেসের পেনাল্টি-সহ মোট চারটি দুর্দান্ত সেভ করা গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড বলেন, “এই অনুভূতিগুলো ভাষায় প্রকাশ করা খুব কঠিন। এটা অসাধারণ এক অনুভূতি। জীবনের সেরা অনুভূতি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল যতদিন সম্ভব এই টুর্নামেন্টে টিকে থাকা। আমরা জানতাম, আমরা আন্ডারডগ। এটাও জানতাম, কাজটা খুব কঠিন হবে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস ছিল, আমরা ব্রাজিলকে হারাতে পারব।”
নিল্যান্ড যোগ করেন, “এখন আমরা আবার ব্রাজিলকে হারিয়েছি। বিশ্বকাপে তো আমরা ওদের কাছে কোনও দিন হারিনি, তাই না? ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য। আমরা সবাই জানি ব্রাজিল কতটা শক্তিশালী দল, বিশ্বকাপে তাদের গুরুত্ব কতটা। এত বড় সাফল্যের পর সত্যিই ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। নরওয়ের সব মানুষের জন্য আমি ভীষণ খুশি। এখন আমরা আরও কিছুদিন এখানে থাকতে পারব। বিশ্বকাপের চেয়ে বড় মঞ্চ আর নেই। আর আমরা এখনও এই মঞ্চে টিকে আছি।”
অন্য দিকে ব্রাজিলের কোচ মানতে রাজি নন যে সোমবার নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে তাঁদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছিলেন, ম্যানচেস্টার সিটির সাড়ে ছ’ফুটের তারকা ফরোয়ার্ড হালান্ড। নেইমারদের কোচ কার্লো আনসেলোত্তি বলেন, “হালান্ডকে আটকানোর জন্য আলাদা করে কোনও ‘অ্যান্টি-হালান্ড’ পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল বলে আমি মনে করিনি। আমার ডিফেন্ডারদের আলাদা করে কীভাবে ওকে সামলাতে হবে, সেটা বলে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ওরা এর আগেও একাধিকবার হালান্ডের বিরুদ্ধে খেলেছে।হালান্ড কীভাবে খেলে, সেটা সবাই জানে। আমার ডিফেন্ডারদের ওর বিরুদ্ধে কীভাবে খেলতে হবে, সেটা নতুন করে বোঝানোর কিছু ছিল না।”
ব্রাজিল আশা করেছিল, ইতালির কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বকাপ খরা কাটাবেন। কিন্তু সেই মিশনের ইতি ঘটল নরওয়ের কাছে যন্ত্রণাদায়ক হারে। ফলে বিশ্বকাপে সেলিসাওয়ের হতাশার অধ্যায় আরও দীর্ঘ হল।
গত বছরের মে মাসে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন আনসেলোত্তি। সম্প্রতি তিনি ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তিও বাড়িয়েছেন। হয়তো তিনিও জানতেন, প্রথম বিশ্বকাপেই খেতাব জেতা কঠিন হবে। কিন্তু শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। তবু ম্যাচ শেষে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন না।
আনসেলোত্তি বলেন, “এক হারে নতুন এক যাত্রার সূচনা হয়। এখন আমাদের কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যেতে হবে এবং নিজেদের আরও উন্নত করতে হবে। এটাই ফুটবল। এটাই খেলা। এই বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হবে। আমরা এই হারকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হিসেবে ব্যবহার করব।”
এই হারের পর ব্রাজিল অধিনায়ক ভিনিসিয়াস জুনিয়র বলেন, “বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া সব সময়ই বড় ধাক্কা। কিন্তু এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এর বাইরে আর কিছু করার নেই।”
এখন ব্রাজিলের লক্ষ্য হবে ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা, তারপর ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ। সেই সময় পর্যন্ত পেলের দেশের বিশ্বকাপ না জেতার অপেক্ষা গিয়ে দাঁড়াবে ২৮ বছরে।
ক্লাব ফুটবলে আনসেলোত্তির সাফল্য ঈর্ষণীয়। পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ভাল ছিল না। খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৯০ সালে খেললেও ইতালি সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারে। এরপর ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ইতালির সহকারী কোচ হিসেবে ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে টাইব্রেকারে হার দেখতে হয় তাঁকে।
তবু নিজের দলের পারফরম্যান্স নিয়ে আনসেলোত্তি বলেন, “আমার মনে হয় না আমরা অসাধারণ কোনও বিশ্বকাপ খেলেছি। তবে আমরা ভালো একটি বিশ্বকাপ খেলেছি।” চোট সারিয়ে ২০২৩ সালের পর প্রথমবার জাতীয় দলে ফেরা ৩৪ বছর বয়সি নেইমারকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল আনচেলত্তির বড় জুয়া। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কাজে আসেনি। নেইমার মাত্র দু’বার বদলি হিসেবে মাঠে নামেন এবং নরওয়ের কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা করেন।
ব্রাজিল কোচ বলেন, “আমাদের নতুন প্রতিভা দরকার। ভবিষ্যতের জাতীয় দলের হয়ে খেলার মতো সর্বোচ্চ মানের ফুটবলার দরকার।” ১৯ বছর বয়সি রিয়াল মাদ্রিদ তারকা এন্দ্রিকই হতে পারেন সেই নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বদানকারী ফুটবলার।
ব্রাজিলীয় ফুটবল কনফেডারেশন (CBF)-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাস যেমন অসংখ্য গৌরবময় সাফল্যে ভরা, তেমনই এমন অনেক কঠিন মুহূর্তও এসেছে, যা আমাদের আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে সাহায্য করেছে।” তারা আরও জানায়, “আজ আমরা বিশ্বকাপকে বিদায় জানাচ্ছি। কিন্তু আমরা নিশ্চিত, আরও শক্তিশালী হয়ে আবার ফিরব।”




