• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 7 July, 2026

জেলের এক একটি মিনিট যেন এক একটি বছর! ১২ দিনের সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা আজও তাড়া করে বেড়ায়

পুলিশের লকআপ, আদালত এবং সংশোধনাগারের অন্ধকার সেল—সব মিলিয়ে জীবনের সবচেয়ে কঠিন ১২ দিন কাটিয়েছিলেন এক শিক্ষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

জেলের এক একটি মিনিট যেন এক একটি বছর! ১২ দিনের সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা আজও তাড়া করে বেড়ায়

প্রতীকী চিত্র

জেলের এক একটি মিনিট যেন এক একটি বছরের সমান। আজও সেই স্মৃতি মনে পড়লে আতঙ্কে শিউরে ওঠেন তিনি। পুলিশের লকআপ, আদালত এবং সংশোধনাগারের অন্ধকার সেল—সব মিলিয়ে জীবনের সবচেয়ে কঠিন ১২ দিন কাটিয়েছিলেন এক শিক্ষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর দাবি, তিনি কোনও অপরাধ করেননি; রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরেই তাঁকে মিথ্যা মামলায় জেলে যেতে হয়েছিল।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের ২২ মে। লেকটাউন থানার পক্ষ থেকে তাঁকে ফোন করে থানায় ডাকা হয়। দুপুর দেড়টার দিকে থানায় পৌঁছনোর পর জানানো হয়, পাঁচ বছর আগের একটি ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ ছিল, উল্টোডাঙার একটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান ভাঙচুরের ঘটনায় তিনি জড়িত। যদিও তাঁর দাবি, মামলায় পরে নতুন করে তাঁর নাম যুক্ত করা হয়েছে।

সারাদিন থানায় বসিয়ে রাখার পর সন্ধ্যা ছয়টার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথম রাত কাটে থানার লকআপে। পরদিন বিধাননগর আদালতে তোলা হলে আদালত তাঁকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়। পরে তিনি ১২ দিন দমদম সংশোধনাগারে ছিলেন।

সংশোধনাগারে পৌঁছে প্রথমেই শুরু হয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। নাম, ঠিকানা, পরিচয় যাচাই, ছবি তোলা—সবকিছু শেষ হওয়ার পর যখন বিশাল লোহার গারদ খুলে তাঁকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনই প্রথমবার বুকের ভেতর ভয় চেপে বসে। তাঁর ভাষায়, ‘গারদ বন্ধ হওয়ার শব্দটা আজও কানে বাজে।’

তাঁর সেলটি ছিল প্রায় ১০ ফুট বাই ৮ ফুটের একটি ঘর। ভেতরে ছোট্ট একটি বাথরুম, মেঝেতে কম্বল পেতে ঘুমানোর ব্যবস্থা। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যেই সব সেল বন্ধ হয়ে যেত। বাইরে টিমটিমে আলো, চারদিকে নীরবতা আর অচেনা মানুষ—সব মিলিয়ে প্রথম রাত ছিল এক দুঃস্বপ্ন।সেলের পাশেই ছিলেন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক বন্দি, যার বিরুদ্ধে এক পুলিশ আধিকারিককে খুনের অভিযোগ ছিল।

প্রথম রাতে আতঙ্ক এতটাই বেড়ে যায় যে তাঁর রক্তচাপ ১৬২/১০৪-এ পৌঁছে যায়। চিকিৎসক এসে ওষুধ দেওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি মিললেও ঘুম আসেনি। মাত্র এক-দেড় ঘণ্টা ঘুমিয়ে তিনি ভেবেছিলেন ভোর হয়ে এসেছে। পরে জানতে পারেন তখনও রাত দেড়টা। সেই দীর্ঘ রাত যেন শেষই হচ্ছিল না।

প্রতিদিন ভোর ছয়টা থেকে আটটা, সকাল দশটা থেকে বারোটা এবং বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা—এই তিন দফায় সেল খোলা হতো। ওই সময়টুকুই বন্দিরা বাইরে হাঁটাচলা করতে পারতেন। বাকি সময় কেটে যেত সেলের ভেতরেই। বাসন ধোয়া, জামাকাপড় পরিষ্কার করা কিংবা চুপচাপ বসে থাকা—এভাবেই সময় কাটত।

জেলের খাবার নিয়ে নানা নেতিবাচক ধারণা থাকলেও তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। সকালে মুড়ি, চিঁড়ে বা পাউরুটি ও লিকার চা, দুপুরে ডাল-ভাত-সবজি এবং রাতে রুটি বা ভাত দেওয়া হতো। তবে মানসিক অস্থিরতায় প্রথম কয়েক দিন তাঁর কিছুই খেতে ইচ্ছে করত না।
পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ছিল নির্দিষ্ট দিনে। মাঝখানে কাচের দেওয়াল, হাতে ইন্টারকম ফোন—সেইভাবেই কথা বলতে হতো। পরিবারের মুখ দেখেও মুক্তির অপেক্ষা আরও তীব্র হয়ে উঠত।

তাঁর অভিজ্ঞতায় সংশোধনাগারের কারারক্ষীদের আচরণ ছিল মানবিক। জেলারও একদিন তাঁর খোঁজ নিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। তবে জেল সম্পর্কে প্রচলিত নানা অভিযোগও তিনি শুনেছেন। আদালত-নিযুক্ত পর্যবেক্ষকদের দাবি, কিছু সংশোধনাগারে প্রভাবশালী দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের প্রভাব থাকে। নতুন বন্দিদের কাছ থেকে অর্থ দাবি, বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে প্রভাব খাটানো কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। যদিও তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা সেই অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।

এই ১২ দিনের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘সিনেমায় জেলখানা যেমন দেখানো হয়, বাস্তব তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু স্বাধীনতা হারানোর কষ্ট, লোহার গারদের ওপারে বন্দি হয়ে থাকার যন্ত্রণা এবং প্রতিটি মিনিটের অসহ্য দীর্ঘতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’

আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে তাঁর চোখ ভিজে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন নিরপরাধ মানুষের কাছে জেলের প্রতিটি মুহূর্ত শুধুই শাস্তি নয়, এক অনন্ত মানসিক যন্ত্রণা। তাঁর কাছে সেই ১২ দিন ছিল যেন ১২ বছরের সমান—এক বিভীষিকাময় অধ্যায়, যা সময়ের সঙ্গে ফিকে হলেও স্মৃতি থেকে কখনও মুছে যাবে না। দীর্ঘ ১২ দিনের কখনো না ভোলার অভিজ্ঞতাকে যেমন তাঁকে আতঙ্কিত করে , তেমনি তার জীবনকে অনেক বেশি অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করে তুলেছে । পাশাপশি তাঁর চরিত্রকে দৃঢ় ও কঠিন হয়ে উঠেছে।