বিশ্বকাপের দুই আয়োজক মেক্সিকো ও কানাডা শেষ ষোলোর রাউন্ড থেকে ছিটকে গিয়েছে আগেই। এ বার আর এক আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রও ছিটকে গেল। মঙ্গলবার সিয়াটলে তাদের ৪-১-এ হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল বেলজিয়াম।
চার্লস দে কেতেলারের জোড়া গোল, হান্স ভানাকেনের বিশ্বকাপে প্রথম গোল এবং বদলি হিসেবে নেমে রোমেলু লুকাকুর শেষ দিকে করা গোলের সৌজন্যে শেষ আটে স্পেনের মুখোমুখি হবে বেলজিয়াম। এর আগে কানাডা ও মেক্সিকোও একই পর্যায় থেকে ছিটকে যাওয়ায় তিন সহ-আয়োজক দেশের কেউই আর টুর্নামেন্টে টিকে রইল না।
গত ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগানকে এই ম্যাচে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। যা নিয়ে এ দিন ফের শুরু হয় বিতর্ক। ম্যাচের আগে বেলজিয়াম ফুটবল সংস্থা (RBFA) ফিফার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন করে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ড দেখার পর একজন ফুটবলারকে পরের ম্যাচে নির্বাসিত থাকতে হয়। তবে বেলজিয়ামের সেই আবেদন গ্রাহ্য হয়নি।
রবিবার সবাইকে অবাক করে দিয়ে ফিফা এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। কারণ, গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে বালোগানকে দেখানো লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।সোমবার ফিফা এক বিবৃতিতে জানায়, ‘বেলজিয়াম ফুটবল সংস্থার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে খারিজ করা হয়েছে। বালোগানকে এক ম্যাচের নির্বাসন দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন করার আইনগত অধিকার তাদের নেই।’
RBFA ফিফার এই সিদ্ধান্তে ‘স্তম্ভিত’। এক বিবৃতিতে তারা মন্তব্য করে, ‘এখন পর্যন্ত ফিফার এই সিদ্ধান্তের কোনো কারণ আমাদের জানানো হয়নি। শুধু তাই নয়, এই প্রক্রিয়া শুরুর পর আমরা যে নথিগুলি চেয়েছি— অর্থাৎ সিদ্ধান্তের কপি, কোন যুক্তিতে ওই খেলোয়াড়কে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে তার ব্যাখ্যা এবং রেফারির রিপোর্ট— সেগুলিও আমাদের দেওয়া হয়নি। ফিফা নিজেই নিজের নিয়ম ভাঙছে।’
চলতি বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত নিয়মাবলী অমান্য করা হয়েছে বলেও ফিফার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে RBFA। সংস্থার দাবি, নিয়মে স্পষ্ট বলা রয়েছে, ‘কোনও খেলোয়াড় বা দলের কোনো কর্মকর্তা যদি সরাসরি লাল কার্ড অথবা দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, তবে তিনি অবশ্যই দলের পরবর্তী ম্যাচে নির্বাসিত থাকবেন।’
সোমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েও দেন যে, তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত এবং বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাচে বালোগানের নির্বাসন পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলাম, কারণ আমার মনে হয়নি ওটা ফাউল ছিল।’ এরপর রসিকতার সুরে তিনি যোগ করেন, ‘সত্যি বলতে, ‘রেড কার্ড’ জিনিসটা কী, সেটাই আমি ঠিক জানতাম না।’ অথচ তাঁর অনুরোধেই বালোগানের শাস্তি মকুব করে দেওয়া হয় ও তিনি এই ম্যাচে সগর্বে মাঠেও নামেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিততে পারেনি তাঁর দল।
রবিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখেন, ‘সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বড় অবিচার সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ!’ সমাজমাধ্যমে মন্তব্যও করা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রেরর হারের পর এ বার না নিয়ম ভেঙে তাদের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে দেওয়ার অনুরোধ করেন ট্রাম্প’।
সোমবার এক বিবৃতিতে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা উয়েফাও ফিফার এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে। উয়েফার ভাষায়, ‘ফিফা সীমা অতিক্রম করেছে। এই সিদ্ধান্ত অভূতপূর্ব, দুর্বোধ্য এবং কোনোভাবেই একে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। যখন নিয়ম রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলিই সেই নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন খেলার সততা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।একই সঙ্গে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে এই সিদ্ধান্ত একটি নজির তৈরি করল। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করতে হবে, যা প্রতিযোগিতার ক্ষতি করবে।’ বিশ্বকাপ জুড়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও সুপরিচিত।
গত বছর ট্রাম্পকে ফিফার প্রথম ‘পিস প্রাইজ’ প্রদান করেন ইনফান্তিনো। উল্লেখ্য, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার চেষ্টা করলেও তা অর্জন করতে পারেননি।গত সপ্তাহে প্রকাশিত ট্রাম্পের ২০২৫ সালের আর্থিক ঘোষণাপত্রে জানা যায়, গত জুলাইয়ে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য ইনফান্তিনো তাঁকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ১০টি টিকিট উপহার দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প সেই ফাইনাল ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন। চেলসি ৩-০ গোলে প্যারিস সাঁ জার্মাঁকে হারানোর পর ইনফান্তিনোর সঙ্গে মাঠে নেমে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিও তুলে দেন তিনি। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধে ফিফা যে নিজেদেরই নিয়ম ভেঙে বিতর্কে জড়াবে, তা ভাবাই যায়নি।




