• facebook
  • twitter
Friday, 9 January, 2026

পৌষ মাস, সংস্কৃতি আর আমরা

শীত মানেই মনটা ফুরফুরে। শীত মানেই একটা আলাদা আমেজ, একটা আলাদা অনুভূতি, একটা আলাদা সুবাস

সুপ্রিয় দেবরায়

কবি সুকান্ত লিখেছিলেন, ‘সকালের এক টুকরো রোদ্দুর / এক টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামি।’ দাদু-ঠাকুমাদের দেখা যেত তখন, আজও দেখা যায় প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে, সূর্যদেবের মিষ্টি রোদের আশায় নাতি-নাতনি কোলে নিয়ে বসে বাড়ির আঙিনায়। আমি যে মফস্বল শহরে থাকি, বাসস্থান থেকে বেরিয়ে প্রথম গলি যেটি চলে গেছে স্টেশন অভিমুখে তারই প্রায় শেষ প্রান্তে হারুর চায়ের দোকানটিতে পৌষের কমলালেবু রোদে গা ভিজিয়ে রাজা-উজির নিধনে রত থাকেন হরিশ জ্যাঠা, কমল কাকারা।

Advertisement

কিন্তু বিগত কয়েকদিন ধরে অফিস যাওয়ার পথে দেখি বেঞ্চ খালি। আজ দেখা পেলাম কমল কাকার, বসে আছেন একা, হাতে পায়ে গ্লাভস মোজা আর মাথায় মাঙ্কি টুপি। ‘কেমন আছেন কমল কাকা, বাকি সঙ্গীরা কোথায়?’ জিজ্ঞেস করতেই ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে উত্তর, ‘আর বোলো না ভায়া, এ বারে যা ঠাণ্ডা পড়েছে কয়েকদিন ধরে জাঁকিয়ে, হাত-পা সব গুটিয়ে যাচ্ছে। ক’দিন ধরে নিম্নচাপের চক্করে রোদ পোহানোর সুযোগও নেই। পায়ের হাড়গুলোতে যেন ঠাণ্ডার সূচ বিঁধছে। আগে হারু মাটির উনুনে চা বানাত, পারতাম একটু হাত-পা সেঁকে নিতে।

Advertisement

এখন সে উপায়ও নেই। আজ সক্কাল-সক্কাল হারুই ফোন করল। বলল, কাকা চলে আসুন। রুম হিটার লাগিয়েছি। তাই আর পারলাম না, বেরিয়ে পড়লাম। বাকিরাও আসছে। আমরা এখানে বসে গুলতানি না করলে, ‘দেশোদ্ধার’-এর মহান দায়িত্বটি আর কে নেবে, ভায়া!’ স্টেশনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতেই নজরে আসে, কমল কাকার পা মেলে ধরা রুম- হিটারের সামনে, ভাঙছে ধীরে ধীরে দেহের জড়তা। আর উষ্ণতার এই আরামবোধের জন্যই হয়তো এই মাত্র ক’টি দিনের হাড়-কাঁপানো শীত আমাদের কাছে আদরের, আহ্লাদের।

পৌষ মাস। এই সময়েই হাড় কাঁপানো শীত জাঁকিয়ে আসে। চারিদিক ঘন কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা, দেখা মেলে না প্রায়শই সকালে সূর্যের কমলা রঙের থালার। ঠোঁট ফাটা, খসখসে পায়ের গোড়ালির চামড়া, হাতে-পায়ে ঘষলেই সাদা খড়ির দাগ, সর্দি-কাশি। মুকুন্দরাম ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে ফুল্লরার বারমাস্যায় শীতের এক সুন্দর বর্ণনা লিখলেন, ‘পৌষে প্রবল শীত সুখী জগজন / তুলি-পাড়ি পাছুড়ি শীতের নিবারণ।’ অর্থাৎ, শীত যত জোরেই পড়ুক না কেন, গরম পোশাক পরলেই, শীত কাবু (তুলি-পাড়ি মানে তোষক গদি আর পাছুড়ি মানে উত্তরীয়)।

তাই এত কষ্টের মাঝেও শীতে সুখের কথা ভুললে তো চলবে না। শীত মানেই মনটা ফুরফুরে। শীত মানেই একটা আলাদা আমেজ, একটা আলাদা অনুভূতি, একটা আলাদা সুবাস। আর তাই তো সকলে পিকনিক কিংবা ছোটোখাটো ভ্রমণে ব্যস্ত সেইসময়। পিকনিক যেটা এখন কর্পোরেট ঢঙে প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল পেতে, মিঠে রোদের পরশ নিতে নিতে ক্যাটারারের বাবুর্চি দ্বারা পরিবেশিত ফিস ফ্রাই সহযোগে রঙিন জল, বিরিয়ানি, মোগলাই ইত্যাদির সহিত; যা কিন্তু আমাদের ছোটবয়সে ছিল বনভোজন অর্থাৎ চড়ুইভাতি।

আমবাগানের তলায় ভাই-বোন আর পাড়াতুতো দাদা-দিদি মিলে ইটের উনুনে পাটকাঠি আর কাঠের টুকরো গুঁজে, কেরোসিন সহযোগে চোখ-জোড়া অগ্নির ন্যায় লাল রঙে রাঙিয়ে অগ্নিদেবতার মুখ দেখার প্রচেষ্টা। আধা-সিদ্ধ ঝাল-ঝাল উনুন-গরম পাঁঠার মাংসের ঝোল কলাপাতায় এক ডাই ভাতের সঙ্গে হাপুস-হুপুস শব্দে সদ্ব্যবহার অশ্রুসিক্ত নয়নে। আর সেই আনন্দের অপেক্ষায় যে আমরা থাকতাম সারা বছর ধরে; শীতকাল কবে আসবে রে—। তখন যে চাহিদা ছিল না বেশি, তাই সুখ আর আনন্দ দুটোই ছিল।

শীতকাল মানেই পড়াশোনার ছুটি, খেজুর রস, নলেন গুড়, সকাল কাটিয়ে লেপ-কাঁথার নীচে মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা, সারা দুপুর পাড়ার মাঠে ব্যাট-বল খেলা, আর সব ছাড়িয়ে পিঠে-পুলি। পিঠে-পুলির কথা আসলেই মনে পড়ে সেই শীতের সন্ধ্যারাতে প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকেই ভেসে আসতো ঢেঁকির ধাপুর-ধুপুর শব্দ। এখন আর নেই সেই গ্রামীণ সংস্কৃতি। শুধু শহর এলাকা নয়, গ্রামীণ এলাকার অধিকাংশ বাড়িতেও ঝামেলার কারণে আজকাল তৈরি হয় না পিঠে। তবে পৌষ-সংক্রান্তি উপলক্ষে একদিনের জন্য হলেও এ প্রায়-হারানো সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন অধিকাংশ গ্রামীণ
মা-বোনেরা।
প্রবাদ রয়েছে, বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণ। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন করা হয় পালন পৌষ-সংক্রান্তি অথবা মকর-সংক্রান্তি। তবে অগ্রহায়ণ মাসেই মাঠ থেকে ফসল ঘরে ওঠে, আর শুরু হয়ে যায় পিঠের প্রস্তুতি তখন থেকেই। পৌষ মাসের শেষ দিনের এক দিন আগেই গেরস্তবাড়ির আঙিনা পরিষ্কার করে নিকিয়ে দেওয়া হয় চালগুঁড়ি দিয়ে কুলো, লক্ষীর পা, ধানের ছড়ার চমৎকার সব আলপনা। মা লক্ষ্মী আসবেন ঘরে তাই করা হয় এই আয়োজন। ধুয়ে মুছে সিঁদুরে মাখিয়ে রাখা হয় ঢেঁকি। কয়েকটি পাকা ধানের শীষ সাথে আমপাতা, মুলোফুল অথবা হলুদ সরষেফুল দিয়ে বিনুনি করে গেঁথে ভক্তিভরে পুজো করে বেঁধে দেওয়া হয় গেরস্তবাড়ির বিভিন্ন জায়গায় সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসেবে।

বাঁধার সময় মুখে মুখে কাটা হয় ছড়া, ‘আওনি বাউনি চাউনি / তিন দিন কোথাও না যেও / ঘরে বসে পিঠে-ভাত খেও।’ ভাষাতাত্বিক কামিনীকুমার রায় এই ছড়াটির ভিতর লুকিয়ে থাকা মানের খোঁজ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আওনি- লক্ষীর আগমন, বাউনি- লক্ষীর বন্ধন, চাউনি- তাঁহার নিকট প্রার্থনা।’ কোথাও কোথাও সংক্রান্তির আগের সন্ধ্যায় পৌষ আগলানোর জন্য গ্রামের বউরা গাইতেন, ‘এসো পৌষ যেও না / জন্ম জন্ম ছেড়ো না।’ আরও কিছু ছড়ার চল আছে গ্রাম-বাংলায়, যদিও প্রায় বিলুপ্ত ধান ভাঙানোর কলের আবির্ভাবে। ‘অ বউ ধান ভানে রে ঢেঁকিতে পার দিয়া / বউ নাচে ঢেঁকি নাচে হেলিয়া দুলিয়া / বউ ধান ভানে রে—।’ গানটি একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল।

তবে অনেকের কাছে গানটি এখনও প্রিয়। একসময় গ্রামে গ্রামে নতুন ফসল তোলার পর ও পৌষ-সংক্রান্তিতে ঢেঁকির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠত গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি। গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাড়িগুলোতে ঢেঁকিঘর হিসাবে আলাদা ঘর থাকত। গৃহস্থবাড়ির মহিলারা ঢেঁকির মাধ্যমে চাল তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতেন। গরিব মহিলারা ঢেঁকিতে শ্রম দিয়ে আয় রোজগারের পথ বেছে নিতেন। ঢেঁকিতে কাজ করাই ছিল দরিদ্র মহিলাদের আয়ের প্রধান উৎস।
পৌষ-সংক্রান্তি মানেই পিঠে-পুলি-পায়েসের উৎসব— চিতই পিঠে, আস্কে পিঠে, গোকুল পিঠে, ভাজা পিঠে,

পাটিসাপটা, চন্দ্রপুলি, ক্ষীরপুলি, দুধপুলি, মুগপুলি, আরও কত কি— বাঙালির রসনাকে তৃপ্তি দিতে কত আয়োজন। শীতকালই হল খেজুরগাছ থেকে টাটকা রস নামিয়ে খেজুর গুড় তৈরির সময়। নারকেল কোরা আর খেজুর গুড়ের অনবদ্য রসায়নে পিঠের মৌতাত। আর খেজুর রসে শীতের সকালকে মনে হয় অন্যরকম, আনন্দে মাতে কুয়াশায় শরীর জড়ানো কনকনে শীতের চাদর। সারা বাড়ি ম-ম করে পিঠে-পুলি-গুড়ের ঘ্রাণে। রাঢ়বাংলার ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে এর বর্ণনা লিখেছেন, ‘আঁউরি-বাঁউরি দিয়া সব বাঁধিতে হইবে। মুঠ-লক্ষ্মীর ধানের খড়ের দড়িতে সমস্ত সামগ্রীতে বন্ধন দিতে হইবে।

আজিকার ধন থাক, কালিকার ধন আসুক, পুরানে-নূতনে সঞ্চয় বাড়ুক। লক্ষ্মীর প্রসাদে পুরাতন অন্নে নূতন বস্ত্রে জীবন কাটিয়া যাক নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায়। অচলা হইয়া থাক্ মা, অচলা হইয়া থাক্।’ অর্থাৎ সোনার পৌষ যে চলে যায়, তাকে যে বাঁধতে হবে এবার! ‘গণদেবতা’ উপন্যাসেই আবার পাওয়া যায়, পৌষ আগলানো পর্ব। ‘পৌষ মাস যখন বিদায় লইয়া অন্ধকারের আবরণে পশ্চিম দিগন্তের মুখে পা বাড়ায়, পূর্ব-দিগন্তে আলোক আভাসের পশ্চাতে মকর রাশিস্থ সূর্যের রথের সঙ্গে উদয় হয় মাঘের প্রথম দিন। তখন কৃষক-বণিতারা পৌষকে বন্দনা করিয়া সনির্বন্ধ অনুরোধ করে— পৌষ, তুমি যাইও না। চিরদিন তুমি থাকো।’

আবার শীতের মরসুম আর মেলা এ দু’য়ের মধ্যে এক মধুর যোগসূত্র চিরকালীন। মেলা বোধহয় সামাজিক মেলামেশার এক ক্ষেত্র। আমাদের ছেলেবেলায় মেলা যেমন দেখেছি, এখন আর তেমন নয়। এখন শীতবস্ত্র, অলঙ্কার, প্রয়োজনীয় দ্রব্য, বই, সাজগোজের সম্ভার, কবিগুরুর ভাষায় বেতের বোনা ধামা কুলো সব কিছুই পাওয়া যায় মেলায়। তবে অবশ্য শুধু শীতকালেই মেলা অনুষ্ঠিত হয় না, সারা বছর ধরে হয়। যেমন রাজপুরের কাছে বসন্তকালে দোলের সময় দোলতলায় হয় দোলমেলা। সাদা জিলিপি, গুড়ের জিলিপি এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে বৈশাখ মাসে হয় বৈশাখীমেলা।

ইছামতীর ধারে বিভূতিভূষণের জন্মস্থানের সন্নিকটে অনুষ্ঠিত হয় বিভূতি মেলা। জ্যৈষ্ঠমাসে বৈঁচিগ্রামে হয় জগৎগৌরীর ঝাঁপান মেলা। আর আমরা কে না জানি, জয়দেব-কেন্দুলির পৌষমেলা সম্বন্ধে, যেটি শুরু হওয়ার অনেক আগেই বাউল সম্প্রদায় ও ভক্তজন অনেকেই অজয় নদের চড়ে আখড়া বসানোর জায়গা বেছে নিয়ে আশ্রম অর্থাৎ আখড়ার ছাউনি ফেলেন। অনাদিকাল থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী মকর সংক্রান্তির সময় গঙ্গাসাগর মেলার মহাতীর্থে উপস্থিত হন মোক্ষপ্রাপ্তির আশায়, সাগরসঙ্গমের পবিত্র জলে ডুবকি লাগিয়ে।

আর পুরো পৌষ মাস জুড়ে, পুরুলিয়ায় টুসু গান আর টুসু পরবের কথা কে না শুনেছি। এমনই একটি মেলা যেখানে বছরের পর বছর ধরে চলা সমাজের একটি স্বাভাবিক ছন্দ ধরা পড়ে। অনেক অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা আর সুখ-দুঃখের মধ্যেও নিজস্ব যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে সেখানকার গ্রামবাসীরা।খড়গপুরে নেমে বাসে হাতিগড়িয়া। সেখান থেকে আবার রোহিণীগামী বাসে মানগোবিন্দপুর। তিন কিলোমিটার দূরে লাউদহ গ্রাম। এই গ্রাম এবং আশেপাশের কিছু গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে আছে সাত বোনের থান। সাতজন দেবীকে সাত বোন বিবেচনা করা হয়। এই থানগুলিতে পুজো হয়। আর সুবর্ণরেখা নদীতীরে বসে থান গোড়ার মেলা। মানতের পুজোর দিন।

বিশেষ পুজোর উপাচার হিসেবে মাটি দিয়ে তৈরি হাতি ও ঘোড়া গাছের নীচে ওই থানে দেওয়া হয়। এই গ্রামগুলিকে সাত বোনের থান ঘিরে রেখেছে আশীর্বাদ আর বরাভয় দিয়ে। ঝিলিমিলি বুড়ির থান আর হাই স্কুলের মাঠে মেলায় যোগ দিতে আসে সব গ্রামবাসীরা। মিলনোৎসব হয় পৌষ সংক্রান্তিতে। এইভাবেই দেশের নানা প্রান্তের বিবিধ সংস্কৃতির মাঝে মিলনের বাঁধনে পালন করা হয় পৌষ সংক্রান্তি অথবা মকর সংক্রান্তি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গণদেবতা’ থেকে অনেক সাহিত্য সংস্কৃতিতে ঘুরে ফিরে এসেছে বাঙালির সংস্কৃতি এবং লোকশিল্প। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন হারিয়ে না যায় এই সংস্কৃতিগুলি। মানুষের অর্থপূর্ণ অস্তিত্বই হল সংস্কৃতির দান।

Advertisement