সূর্য আবার অশান্ত। ৮ অক্টোবর তার পিঠে ঘটে গিয়েছে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ। তার জেরে ১১ অক্টোবর, রবিবার পৃথিবীতে হানা দিতে পারে মাঝারি মাত্রার ভূচৌম্বকীয় ঝড় (geomagnetic storm)। উপগ্রহের সিগন্যাল, যোগাযোগ ব্যবস্থা এমনকি উড়ানেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন আবহাওয়া ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণ সংস্থা নোয়া (National Oceanic and Atmospheric Administration বা NOAA) ইতিমধ্যেই ঝড়ের গতিপথের উপর নজর রাখতে শুরু করেছে।
সূর্যে ঠিক কী হয়েছে?
বিস্ফোরণের উৎস ৪৫৪৯ নম্বর সৌরকলঙ্ক অঞ্চল (sunspot region 4549)। বিজ্ঞানীরা একে এম৬.৭ শ্রেণির সৌরঝলক (M6.7-class solar flare) হিসাবে নথিভুক্ত করেছেন। অর্থাৎ ঝলকটি মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার।
সূর্যের গায়ে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের টানাপড়েন চরমে পৌঁছলে এমন বিস্ফোরণ ঘটে। তখন প্রচণ্ড শক্তি বিকিরণ হিসাবে ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশে। অনেক সময় সঙ্গে ছিটকে বেরোয় করোনাল মাস ইজেকশন বা সিএমই (coronal mass ejection)। সহজ ভাষায় সূর্যের তপ্ত গ্যাস আর আধানযুক্ত কণার বিশাল এক মেঘ। এই মেঘই এখন সেকেন্ডে কয়েকশো কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর দিকে ছুটছে।
পৃথিবীর কী ক্ষতি হতে পারে?
পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে একটি অদৃশ্য চৌম্বকীয় ঢাল, যার নাম ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (magnetosphere)। মহাজাগতিক ক্ষতিকর কণা থেকে এই ঢালই আমাদের বাঁচায়। কিন্তু সৌরকণার ধাক্কা জোরালো হলে ঢালটি নড়ে ওঠে। তখনই তৈরি হয় ভূচৌম্বকীয় ঝড়। নোয়ার বিজ্ঞানীরা এবারের ঝড়কে মাঝারি মাত্রার বলেই মনে করছেন।
তবে মাঝারি হলেও ঝুঁকি একেবারে নেই, তা নয়। প্রথম সমস্যা রেডিয়ো যোগাযোগে। আয়নমণ্ডলে অস্থিরতা তৈরি হলে হাই-ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়ো সিগন্যাল (high-frequency radio) হঠাৎ দুর্বল হতে পারে, এমনকি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। ফলে দূরপাল্লার উড়ান ও সমুদ্রে চলা জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা থাকে।
দ্বিতীয় ঝুঁকি মহাকাশে ঘুরতে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ (satellite) নিয়ে। আধানযুক্ত কণার সরাসরি ধাক্কায় উপগ্রহের স্পর্শকাতর ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে মাটির উপর জিপিএস নেভিগেশনেও (GPS navigation)। মোবাইলের মানচিত্র তখন ভুল অবস্থান দেখাতে পারে।
তৃতীয় আশঙ্কা বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে। দীর্ঘ পাওয়ার গ্রিডের (power grid) লাইনে বাড়তি ভোল্টেজ ঢুকে পড়লে ট্রান্সফর্মার বিকল হওয়ার ভয় থাকে। যদিও নোয়ার মতে, মাঝারি মাত্রার ঝড়ে বড় কোনও ব্ল্যাকআউটের সম্ভাবনা কম।
আকাশে কি রঙের খেলা?
যন্ত্রের পক্ষে যা দুশ্চিন্তার, আকাশপ্রেমীদের কাছে তা-ই হয়ে উঠতে পারে উৎসব। সৌরকণা যখন উচ্চ বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের অণুতে ধাক্কা মারে, তখন জন্ম নেয় মেরুজ্যোতি (aurora), যা উত্তর মেরুতে নর্দার্ন লাইটস (northern lights) নামেও পরিচিত।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস, ১১ অক্টোবর ভূচৌম্বকীয় অস্থিরতা বাড়লে মেরু বৃত্ত থেকে অনেকটা নীচের অক্ষাংশের দেশগুলির আকাশেও সবুজ আর লালচে আলোর নাচ দেখা যেতে পারে।
আতঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে?
না, ভয়ের কিছু নেই। এই ধরনের সৌরঝড়ে মানুষের শরীরের সরাসরি ক্ষতি হয় না। পৃথিবীর পুরু বায়ুমণ্ডল তেজস্ক্রিয়তা থেকে আমাদের সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখে।
চিন্তা শুধু প্রযুক্তি নিয়ে। ইন্টারনেট, জিপিএস আর উপগ্রহের উপর আমাদের নির্ভরতা এখন প্রায় পুরোপুরি। তাই বিভিন্ন দেশের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র সর্বক্ষণ পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। উপগ্রহ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলিকেও প্রয়োজনে সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।




