• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 10 October, 2026

‘প্রতিবাদ করলেই অপরাধ নয়’, ৬ এসএসসি চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ হাইকোর্টের

শুধুমাত্র কোভিডবিধি লঙ্ঘনের সাধারণ অভিযোগের ভিত্তিতে বিপর্যয় মোকাবিলা আইনের ৫১ ধারাও প্রয়োগ করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ আদালতের। কোনও নির্দিষ্ট বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছিল, কীভাবে তা করা হয়েছিল কিংবা সরকারি আধিকারিকের কাজে কীভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তার উল্লেখও ছিল না এফআইআরে।

‘প্রতিবাদ করলেই অপরাধ নয়’, ৬ এসএসসি চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ হাইকোর্টের

Calcutta High Court Photo-SNS

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই তা অপরাধ হয়ে যায় না। কর্তৃপক্ষের অপছন্দের কারণেই কোনও বিক্ষোভকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। এসএসসি নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ছয় চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা খারিজ করে এমনই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতি অনুজ সিংহের পর্যবেক্ষণ, এফআইআরে উল্লিখিত অভিযোগগুলির ক্ষেত্রে অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদানই স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি।

আদালতের মতে, প্রতিবাদ করার কারণেই আবেদনকারীদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, এমনটাই অনিবার্যভাবে মনে হচ্ছে। এই মামলাকে হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে আদালত। ২০২১ সালের ৫ আগস্ট নিয়োগে কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে সল্টলেকের ময়ূখ ভবনের কাছে জড়ো হয়েছিলেন এসএসসি চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের দাবি আদায়ের জন্য স্লোগান দিতে দিতে বিকাশ ভবনের দিকে এগোচ্ছিলেন তাঁরা।

অভিযোগ, ওই জমায়েত কোভিডবিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছিল। পুলিশের আরও অভিযোগ, সরে যেতে বলা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা সরে যাননি। জনসাধারণের চলাচলে বাধা দিয়েছেন এবং সরকারি আধিকারিকদের কাজে বিঘ্ন ঘটিয়েছেন। এই ঘটনায় মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছয়জন পরবর্তী সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তৃণা হালদার-সহ অন্য আবেদনকারীরা বিধাননগর উত্তর থানায় দায়ের হওয়া মামলাটি খারিজ করার আবেদন জানান।

ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৩ ধারায় বেআইনি জমায়েতের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে আদালত জানায়, পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত হলেই তাকে বেআইনি বলা যায় না। জমায়েতের উদ্দেশ্য অবশ্যই আইনের ১৪১ ধারায় নির্দিষ্ট বেআইনি উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে পড়তে হবে। কিন্তু এই মামলার এফআইআরে বিক্ষোভকারীদের জমায়েতের এমন কোনও বেআইনি সাধারণ উদ্দেশ্যের উল্লেখ নেই।

আগের একটি মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করে আদালত জানায়, বড় জমায়েত বা বিক্ষোভ নিজে থেকেই বেআইনি কিংবা অসাংবিধানিক হয়ে যায় না। সংবিধানের ১৯(১)(বি) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়ার অধিকার স্বীকৃত। সুপ্রিম কোর্টের মামলার প্রসঙ্গ টেনেও আদালত জানায়, সরকারের সমালোচনা করা, ভিন্নমত প্রকাশ করা এবং আইন মেনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগের ক্ষেত্রেও এফআইআর নিয়ে প্রশ্ন তোলে আদালত। বিক্ষোভের সময় ১৪৪ ধারা জারি থাকার কথা বলা হলেও সেই নির্দেশের কপি আদালতে পেশ করা হয়নি। এর পাশাপাশি, বিক্ষোভকারীরা কীভাবে জন চলাচলে বাধা দিয়েছিলেন বা সরকারি আধিকারিকদের কাজে বিঘ্ন ঘটিয়েছিলেন, তারও স্পষ্ট ব্যাখ্যা এফআইআরে ছিল না।

সুপ্রিম কোর্টের মামলার উল্লেখ করে আদালত জানায়, ১৪৪ ধারা জারির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিস্থিতির উল্লেখ থাকা জরুরি। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের জন্যই এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যেতে পারে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪১ ধারায় বেআইনিভাবে কাউকে চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির চলাচল কীভাবে আটকানো হয়েছিল, তা এফআইআরে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকী কতক্ষণ বা কোন পরিস্থিতিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য ছিল না।

অন্যদিকে, ২৬৯ ও ২৭০ ধারায় সংক্রামক রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করার অভিযোগের ক্ষেত্রেও আদালত জানায়, বিক্ষোভকারীদের কোনও নির্দিষ্ট কাজের ফলে কোভিড সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা এফআইআরে বলা হয়নি। আবেদনকারীরা সংক্রমিত ছিলেন অথবা তাঁরা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে জানতেন এমন অভিযোগও ছিল না।

শুধুমাত্র কোভিডবিধি লঙ্ঘনের সাধারণ অভিযোগের ভিত্তিতে বিপর্যয় মোকাবিলা আইনের ৫১ ধারাও প্রয়োগ করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ আদালতের। কোনও নির্দিষ্ট বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছিল, কীভাবে তা করা হয়েছিল কিংবা সরকারি আধিকারিকের কাজে কীভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তার উল্লেখও ছিল না এফআইআরে।

হাইকোর্ট জানায়, অভিযোগের সমস্ত বক্তব্য সত্য বলে মেনে নিলেও যদি কোনও অপরাধের প্রাথমিক উপাদান প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে উপযুক্ত ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা খারিজ করা যেতে পারে। একইভাবে, মামলা যদি স্পষ্টতই অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, সেক্ষেত্রেও আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে। এফআইআরের সামগ্রিক বক্তব্য খতিয়ে দেখে ছয় আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের প্রাথমিক ভিত্তি খুঁজে পায়নি আদালত। এরপরই বিধাননগর উত্তর থানার এফআইআর এবং তার ভিত্তিতে শুরু হওয়া সমস্ত পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট।