গত ১৫ বছরে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কী নিয়ম মানা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে উদ্যোগী হয়েছে নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার এবার নিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও নথি খতিয়ে দেখার পথে হাঁটছে। কোন দফতরে কতজন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে এবং সেই নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশিকা ও নিয়মবিধি মেনে চলা হয়েছিল কি না, তা বিস্তারিত ভাবে যাচাই করতে চাইছে নবান্ন।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, বিভিন্ন সরকারি দফতরে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি কর্মীদের নিয়োগ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য দ্রুত জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই সেচ ও জলসম্পদ দফতর রাজ্যের সমস্ত সার্কেলের সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে রিপোর্ট চেয়েছে। অর্থ দফতরের নির্দেশিকা মেনে সংশ্লিষ্ট নিয়োগগুলি হয়েছিল কি না, কোনও কর্মীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, অসদাচরণ কিংবা অন্য কোনও অভিযোগ রয়েছে কি না, সেই সংক্রান্ত তথ্যও নথিপত্র-সহ জমা দিতে বলা হয়েছে। আগামী ৬ নভেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য প্রশাসনের একাংশের অভিযোগ, গত দেড় দশকে স্থায়ী শূন্যপদে নিয়মিত নিয়োগের পরিবর্তে বিপুল সংখ্যায় অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, যথাযথ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার নিয়ম উপেক্ষা করে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সরকারি দফতর ও সংস্থায় চুক্তিভিত্তিক পদে নিয়োগ করা হয়েছিল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাজ্যে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৫ লক্ষ। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দফতর ও সরকারি পরিষেবায় অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। ২০১২ সালে একসঙ্গে দমকল বিভাগে ১,৬৯২ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর পর ২০১৩ সালে পুলিশি সহায়তার জন্য ১.৩০ লক্ষ সিভিক পুলিশ নিয়োগের অনুমোদন মেলে। পরবর্তী সময়ে সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রাম পুলিশ ও গ্রিন পুলিশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই তিন শ্রেণি মিলিয়ে কর্মীর সংখ্যা ১.১৫ লক্ষেরও বেশি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের রাজ্য বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। ২০২৬ সালের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যে সব মিলিয়ে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক নিয়োগের পিছনে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল, তা নিয়েই এবার বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু করেছে নবান্ন।
চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে পূর্বতন সরকারকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন কনট্র্যাকচুয়াল এমপ্লয়িজ় অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা মনোজ চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য, বছরের পর বছর ধরে রাজ্যে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। অথচ সরকারি দফতরগুলিতে লক্ষ লক্ষ স্থায়ী পদ এখনও শূন্য পড়ে রয়েছে। স্থায়ী কর্মী নিয়োগ না করে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের প্রবণতা একদিকে যেমন রাজ্যের কোষাগারের উপর চাপ তৈরি করেছে, অন্যদিকে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
মনোজ চক্রবর্তীর কথায়, গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি-সহ বিভিন্ন স্তরে বিপুল সংখ্যক স্থায়ী পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। বাম আমল থেকেই এই সমস্যা চলে আসছে। কিন্তু গত ১৫ বছরে সেই শূন্যপদ পূরণের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। এর ফলে কর্মীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অধিকাংশেরই পেনশন কিংবা অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
নতুন সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক পদে কাজ করছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হোক। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনিয়মিত কর্মীদের স্থায়ী পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক। এমনকি যোগ্য গ্রুপ ডি কর্মীদের গ্রুপ সি পদে উন্নীত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, রাজ্যের বিভিন্ন দফতরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অতীত প্রক্রিয়া নিয়ে নবান্নের এই উদ্যোগ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। দফতরওয়াড়ি রিপোর্ট ও নিয়োগ সংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের পর কোথাও নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের প্রমাণ মেলে কি না, এবং সে ক্ষেত্রে সরকার কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে প্রশাসনিক মহল।




