গ্রেপ্তারের আগে জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের নামে কাউকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখতে পারবে না পুলিশ। সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করার সময়সীমা শুরু হবে তাঁর স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার মুহূর্ত থেকেই। আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর সময় থেকে নয়। গ্রেপ্তার ও আটক, এই দুইয়ের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন টেনে পুলিশের হেফাজতে থাকার সময় বাদ দেওয়ার যুক্তি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। বৃহস্পতিবার এই গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট।
বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া এবং বিচারপতি অতুল এস চন্দুরকরের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদ এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ৫৬ নম্বর ধারার নির্দেশ এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। গ্রেপ্তারের আগে তদন্তের প্রয়োজনে কাউকে আটক রাখা হলে, সেই সময়কেও ২৪ ঘণ্টার হিসেবের মধ্যে ধরতে হবে। একমাত্র আটকস্থল থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় যাত্রার সময়টুকুই বাদ দেওয়া যাবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, অল্প সময়ের জন্য আটক রাখা হয়েছে বলে তাকে গ্রেপ্তার হিসেবে গণ্য করা হবে না, এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, মৌলিক অধিকার কোনও সাময়িক বিরতির বিষয় নয়। আটক রাখার সময়সীমা নিয়ে পুলিশের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যার সুযোগ থাকলে সংবিধান প্রদত্ত সুরক্ষাই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
এই মামলায় ত্রিপুরা হাইকোর্টের জামিন নাকচের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন চার অভিযুক্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে এনডিপিএস আইনে মামলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো নাগাদ তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তের সময় তাঁদের আটক করে পুলিশ। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয় পরের দিন, ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায়। অর্থাৎ, প্রায় ২১ ঘণ্টা আগে থেকেই তাঁরা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো থেকেই ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা গণনা করা উচিত ছিল। আদালত জানায়, প্রায় ১৮ ঘণ্টা তাঁদের বিচারবিভাগীয় নজরদারির বাইরে আটকে রাখা হয়েছিল। যা সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এই সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের কারণেই চার অভিযুক্তকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
শুধু পুলিশের জন্য নয়, ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্বও এদিন স্পষ্ট করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করার সময় তাঁর প্রকৃত আটক হওয়ার তারিখ ও সময় নথিভুক্ত করতে হবে। সেই সময় থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে হাজির করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। সময়সীমা লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। এমনকী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করা হলেও আটক রাখার সময়টি মামলার পরিস্থিতিতে যুক্তিসঙ্গত ছিল কি না, তা বিচার করতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটকে। অযৌক্তিক দীর্ঘ আটক মনে হলে রিমান্ড মঞ্জুর নাও করতে পারেন তিনি।
এর পাশাপাশি, ওড়িশা হাইকোর্টের আর্যমান পট্টনায়ক, মাদ্রাজ হাইকোর্টের কান্নান এবং কেরল হাইকোর্টের অরুণ কে থমাস মামলার পর্যবেক্ষণকে সঠিক আইন বলে মানতে অস্বীকার করেছে শীর্ষ আদালত। অন্যদিকে, কেরল হাইকোর্টের বিশ্বজিৎ মণ্ডল মামলায় দেওয়া ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেছে। ওই মামলাতেও বলা হয়েছিল, আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের সময় নয়, প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার মুহূর্ত থেকেই ২৪ ঘণ্টার হিসেব শুরু হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ! নজিরবিহীন নির্দেশ হাইকোর্টের
আদালতের মতে, হেফাজতে নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা বিচারবিভাগীয় নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই তদন্তের নামে আটক রেখে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার দেখাতে দেরি করে সংবিধানের সুরক্ষা এড়ানোর পথ আর খোলা থাকল না।




