• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 28 July, 2026

Explained: কৃত্রিম সূর্য গড়ার পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, বিশ্বের বৃহত্তম ৫৮২ টনের চুম্বক বানিয়ে চমক দিল চিন

পরমাণু ফিউশন প্রযুক্তিতে কৃত্রিম সূর্য বানানোর লক্ষ্যে বিশ্বের বৃহত্তম সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক তৈরি করে ফেলল চিন। আইটিইআর প্রকল্পে ভারতের ভূমিকাও জেনে নিন।

Explained: কৃত্রিম সূর্য গড়ার পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, বিশ্বের বৃহত্তম ৫৮২ টনের চুম্বক বানিয়ে চমক দিল চিন

কৃত্রিম সূর্য বানানোর পথে চিন (Pic-X/@forallcurious)

সূর্যের বুকে যে অগ্নিকুণ্ড লুকিয়ে, পৃথিবীর বুকেই তার প্রতিরূপ তৈরির লক্ষ্যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল চিন (China)। পরমাণু ফিউশন (Nuclear Fusion) প্রযুক্তিতে ভর করে বেজিং কৃত্রিম সূর্য (Artificial Sun) বানানোর স্বপ্নে সামিল হয়েছে বহু দিন। সেই লক্ষ্যেই এ বার তৈরি করে ফেলল বিশ্বের সবচেয়ে ভারী সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক (Superconducting Magnet), যার ওজন প্রায় ৫৮২ টন। চিনা বিজ্ঞান আকাদেমির (Chinese Academy of Sciences) অধীন ইনস্টিটিউট অফ প্লাজমা ফিজিক্সের (Institute of Plasma Physics) বিজ্ঞানীরা সদ্য এই চুম্বক-সম্পর্কিত যাবতীয় পরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন হেফেই শহরে।

দৈত্যাকার চুম্বক

ইংরেজি ডি অক্ষরের আদলে তৈরি এই টরয়ডাল ফিল্ড ম্যাগনেট (Toroidal Field Magnet) লম্বায় ২১ মিটার, চওড়ায় ১২ মিটার এবং উচ্চতায় ৩.৩ মিটার। ওজনের নিরিখে এটি প্রায় ৩০০ পণ্যবাহী ট্রাকের সমান। ফরাসি মুলুকে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক ফিউশন প্রকল্প আইটিইআরের (ITER) সমতুল্য চুম্বকের তুলনায় এর আয়তন প্রায় দেড় গুণ বেশি, আর শক্তি ধরে রাখার ক্ষমতা প্রায় তিন গুণ। এমন ১৬টি অভিন্ন চুম্বক জুড়েই তৈরি হবে সম্পূর্ণ বৃত্তাকার কাঠামো। সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়েছে একটি উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টিং সেন্ট্রাল সোলেনয়েড কয়েলও (Central Solenoid Coil), যাকে প্লাজমা প্রবাহ স্থিতিশীল রাখার ইগনিটার বলা চলে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়, এই গোটা যন্ত্রের তার থেকে শুরু করে ইস্পাত, সবটাই সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করেছে চিন। ৬ বছরের গবেষণা ও পরীক্ষার ফসল হিসেবে চিনের হাতে এখন ৪৭টি পেটেন্ট এবং ১৪টি নতুন প্রযুক্তিগত মান।

কী ভাবে কৃত্রিম সূর্য

টোকামাক (Tokamak) নামের ডোনাট আকৃতির যন্ত্রে হাইড্রোজেনের আইসোটোপকে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে তা পরিণত হয় প্লাজমায় (Plasma), যা সূর্যের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রার চেয়েও বহু গুণ বেশি উত্তপ্ত। এমন প্রচণ্ড উষ্ণ পদার্থের সংস্পর্শে কোনও ধাতুই টিকতে পারে না। তাই চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে শূন্যে ভাসিয়ে রাখা হয় সেই প্লাজমাকে, যাতে চুল্লির দেওয়াল স্পর্শ না করে। ঠিক এই কাজটাই করবে নতুন তৈরি বিশালাকার চুম্বকটি। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই সাফল্যের ফলে ফিউশন চুল্লির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের উপর সম্পূর্ণ দেশীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে চিন।

চিনের ক্র্যাফট (CRAFT) নামক পরিকাঠামোর অধীনে তৈরি হয়েছে এই চুম্বক, যা আসলে ভবিষ্যতের বাস্তব ফিউশন চুল্লি তৈরির আগে যন্ত্রাংশ পরখ করার একটি পরীক্ষাগার। উল্লেখ্য, চিনের ইস্ট (EAST) নামের পরীক্ষামূলক টোকামাক চুল্লি ইতিমধ্যেই ১০৬৬ সেকেন্ড ধরে প্লাজমা স্থিতিশীল রাখার নজির গড়েছে, যা কৃত্রিম সূর্য প্রকল্পের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত

ফ্রান্সে নির্মীয়মাণ আন্তর্জাতিক ফিউশন প্রকল্প আইটিইআরে সপ্তম পূর্ণ সদস্য হিসেবে ২০০৫ সাল থেকে যুক্ত রয়েছে ভারতও। গুজরাতের গান্ধীনগরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা রিসার্চের (Institute for Plasma Research) অধীনে থাকা আইটিইআর-ইন্ডিয়া এই প্রকল্পে প্রায় ৯ শতাংশ আর্থিক তথা যন্ত্রাংশের অংশীদার। আইটিইআরের বিশাল ক্রায়োস্ট্যাট, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি তাপন প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরি করেছে ভারতীয় বিজ্ঞানী ও শিল্প সংস্থাগুলি। এর পাশাপাশি আদিত্য এবং এসএসটি-১ নামে নিজস্ব দু’টি টোকামাক নিয়েও গবেষণা চালাচ্ছে ভারত।

কবে হাতে আসবে

জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে কার্বন নিঃসরণহীন এবং প্রায় সীমাহীন শক্তির উৎস হতে পারে পরমাণু ফিউশন, এমনটাই মত বিজ্ঞানী মহলের একাংশের। সৌরবিদ্যুতের মতো আবহাওয়ানির্ভর নয়, আবার জীবাশ্ম জ্বালানির মতো দহনও প্রয়োজন হয় না এই প্রযুক্তিতে। ২০৩০ সালের মধ্যে ফিউশন শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধেছে বেজিং। সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথে সাম্প্রতিক এই সাফল্যকে বড় মাইলফলক হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা, যদিও বাণিজ্যিক ভাবে ফিউশন বিদ্যুৎ উৎপাদনের রাস্তায় এখনও একাধিক প্রযুক্তিগত ও আর্থিক বাধা পেরোনো বাকি।