• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 2 July, 2026

রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী বন সম্মেলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি-৩ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যহানি

জলবায়ু পরিবর্তন সঙ্গক্রান্ত বিষয়ে সম্প্রতি জার্মানির বন-এ অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিবেশনে

রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী বন সম্মেলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি-৩ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যহানি

জলবায়ু পরিবর্তন সঙ্গক্রান্ত বিষয়ে সম্প্রতি জার্মানির বন-এ অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিবেশনে বিশ্বের পরিবেশ সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা রূপায়ণে অর্থ সংস্থানের ব্যাপারে যা-ই অগ্রগতি হোক না কেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যে সারা পৃথিবীর মানুষের স্বাস্থ্যহাণীর বিষয়টি যুক্ত, সেটা অন্তত রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই সংক্রান্ত পরবর্তী বার্ষিক অধিবেশনের অলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু সংক্রান্ত বার্ষিক অধিবেশনের মাঝে প্রতি বছর জার্মানির বনে একটি ষান্মাসিক সম্মেলন হয়, সেটি মূলত পরবর্তী বার্ষিক অধিবেশনের কার্যবিবরণী প্রস্তুত করে। যেমন গত জুনে বনে অনুষ্ঠিত সাবসিডিয়ারি বডির ৬৪ তম বৈঠক, যা এসবি-৬৪ নামে পরিচিত, যেখানে আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আন্তলিয়াতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের যে পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ অনুষ্ঠিত হবে তার কার্যবিবরণী নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং তাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যহাণীর বিষয়টি-কে সেই আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এটাকে একদিক থেকে একটা বিশাল অগ্রগতি বলা চলে। এতদিন পরিবেশ দূষণজনিত ক্ষতি ও তা রোধ করার পদক্ষেপ নিয়ে চর্চা হত রাষ্ট্রসঙ্ঘের সমস্ত জলবায়ু সম্মেলনে। তাতে মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়টা কখনো কখনো আলোচনায় উঠে এলেও, এত প্রত্যক্ষভাবে তা কখনও আসত না। এবার সরাসরি জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি কপ-৩১ এর আলোচ্যসুচিতে উঠে এলো। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষের জীবণধারণের এবং জীবিকার সমস্যার সঙ্গে এই কারণে মানুষের শরীর-স্বাস্থ্যের ক্ষতির বিষয়টিও যে আগামী বিশ্ব সম্মেলনের মূল আলোচ্যসূচিতে যুক্ত হচ্ছে এবং তা রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনাতে যে সরাসরি যুক্ত হল, এটা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট পদক্ষেপ।
বন সম্মেলনের আগেই তুরস্কের রাইট টু ক্লিন এয়ার প্ল্যাটফর্ম-এর উদ্যোগে এবিষয় গঠিত একটি জোট এই নিয়ে একটি দাবিপত্র জমা দিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আগামী নভেম্বরে তুরষ্কতেই হতে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলন। সেক্ষত্রে সেই দেশের সংস্থার নেতৃত্বে স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে তুলে ধরার ব্যাপারটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বক্তব্য স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জোটটি দাবি করেছে যে আগামী কপ ৩১ এর আলোচ্যসূচিতে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি, জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল যে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, সেই বিষয়টিকেও
সরকারিভাবে মেনে নিতে হবে। এই দাবিটি মূলত রাইট টু ক্লিন এয়ার প্ল্যাটফর্ম-এর নেতৃত্বে উঠে এলেও এতে সায় দিয়েছে সারা বিশ্বে এনিয়ে কাজ করা নানান আন্তর্জাতিক সংগঠন যার মধ্যে রয়েছে তুরষ্কের মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন।  উল্লেখযোগ্য, কপ ৩১-এর সভাপতির অফিস ইতিমধ্যেই এই বিষয়টিকে আগামী সম্মেলনে আলোচনার বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভারতের কাছেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে এক নজিরবিহীন ও গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ দিনেই দেশের কোনও না কোনও অঞ্চলে কোনো না কোনো আবহাওয়াজনিত বিপর্যয় ঘটেছে, যার মূল কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এর ফলে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ক্রমশ  চাপ বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল ও দূষণ রোধের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার জন্য অর্থের সংস্থানের বিষয় বন-এ বৈঠক হয়েছে। অন্যদিকে তার আগেই আবহাওয়া জনিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওলজিকাল অরগানাইজেশন (ডব্লু এম ও) ভুটানে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া ২০২৫’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত সমস্যার প্রকোপ এবং ভয়াবহতা আরও বাড়ছে। প্রতিবেদনে সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য জীবন রক্ষাকারী আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গ্রহনের বিষয়টিতে আরও জোর দিতে হবে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল এশিয়ার ইতিহাসে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ উষ্ণতম বছর। গত তিন দশকে এশিয়ায় উষ্ণায়নের হার সারা বিশ্বের গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ড গরম দেখা গেছে। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ জনজীবন বিপর্যস্ত করে। চরম আবহাওয়ার আরেক দিক ছিল অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। পাকিস্তানে মৌসুমি বন্যায় এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩০ লক্ষের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভিয়েতনামে বন্যায় অন্তত ২০০ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ১৯০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান-সহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও জলসংকট আরও তীব্র হয়েছে। প্রবল ধূলিঝড়ও পরিবহণ ও জনস্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিবেদনে ভারতের সংকটের বিষয়েও আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো ভারতও ২০২৫ সালে চরম তাপপ্রবাহের প্রভাব অনুভব করেছে। সমগ্র এশিয়ায় উষ্ণায়নের হার সারা বিশ্বের গড়ের প্রায় দ্বিগুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে ভারতীয় উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ১৯৯৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে প্রায় ৪.৯ মিলিমিটার করে বেড়েছে, যা বিশ্বের গড় (প্রায় ৩.৬ মিলিমিটার)-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর ফলে উপকূলীয় ক্ষয়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে। বঙ্গোপসাগর এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীর অন্তর্গত ভারত মহাসাগরে সমুদ্রের অম্লত্ব (ওশান এসিডিফিকেশন) বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। হিমালয়-সংলগ্ন হাই মাউন্টেন এশিয়া অঞ্চলের সব পর্যবেক্ষণাধীন হিমবাহ ২০২৫ সালে তাদের ভর হারিয়েছে। এই অঞ্চলের হিমবাহ থেকেই গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধুসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ নদীর উৎপত্তি। ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় ভবিষ্যতে ভারতের জলনিরাপত্তা, কৃষি এবং নদীনির্ভর জনজীবনের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ ও সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা ভারতের উপকূলীয় অঞ্চল এবং মৎস্যসম্পদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে।
ডব্লুএমও-র মূল্যায়ন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারতের জন্যও উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-প্রস্তুতিতে আরও বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।