মণিপুরে নতুন করে জাতিগত হিংসার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে দু’দিনের সশস্ত্র সংঘর্ষে তিনটি জেলায় অন্তত নয়জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১১ হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মায়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি ন্যাশনাল আর্মি-বার্মার দুই সদস্যও রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু মণিপুরের আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের সামাজিক শান্তি ও জাতিগত সম্প্রীতির পক্ষেও এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মুখ্যমন্ত্রী যুমনাম খেমচাঁদ সিং সাধারণ নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড ও হিংসার নিন্দা করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কামজং ও কাংপোকপি জেলায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাবাহিনী পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতা এবং সামাজিক সংগঠনগুলিকে সংযম দেখানোর ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহযোগিতা করার আবেদন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই আবেদন গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু আবেদন জানানো বা নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করলেই যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর হবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই।
গত ৯ অক্টোবর রাতে নাগা-অধ্যুষিত কামজং জেলায় হিংসার সূত্রপাত হয়। চাসাদ কুকি গ্রামে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের গুলিতে ৪২ বছরের এক কুকি মহিলার মৃত্যু হয়। পরের দিন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সংঘর্ষে আরও এক কুকি যুবকের প্রাণ যায়। শনিবার কামজংয়ের অন্য এলাকায় দুই নাগা পুরুষ নিহত হন। একই সময়ে উখরুল জেলায় নিজেদের ইজারা নেওয়া জমিতে যাওয়ার পথে এক গুর্খা কৃষককে হত্যা করা হয় বলে খবর। এর কয়েক ঘণ্টা পর কাংপোকপি জেলায় পৃথক দুটি হামলায় চার নাগার মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের দাবি, নিহতদের মধ্যে একজনের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলির ধারাবাহিকতা দেখিয়ে দেয়, হিংসা কত দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে আরেকটি হামলা, তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আরও প্রাণহানি— এভাবে পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হল, কোনও ব্যক্তির অপরাধের দায় যখন গোটা একটি সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো হয়, তখন নিরীহ মানুষও প্রতিশোধের লক্ষ্য হয়ে ওঠেন। জাতিগত পরিচয় তখন মানুষের নিরাপত্তার বদলে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মণিপুরে জাতিগত উত্তেজনা নতুন নয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে জমি, পরিচয়, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ঘিরে উদ্বেগ ও বিরোধ রয়েছে। এই ধরনের বিরোধের সঙ্গে যখন দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস যুক্ত হয়, তখন সামান্য ঘটনাও বড় সংঘর্ষের রূপ নিতে পারে। তবে বর্তমান সংঘর্ষের নির্দিষ্ট কারণ ও দায় নির্ধারণের জন্য প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কোনও সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে দোষী করা বা যাচাই না করা খবরের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। কামজংয়ের ফুংইয়ার কেন্দ্রের নাগা বিধায়ক লেইশিয়ো কেশিং রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কন্থৌজম গোবিন্দাসের কাছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর এই আবেদন থেকে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার প্রশ্নটি কতটা জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত নিরাপত্তা পৌঁছে দেওয়া, আক্রান্ত গ্রামগুলিকে সুরক্ষা দেওয়া, আহতদের চিকিৎসা এবং আতঙ্কিত পরিবারগুলিকে সাহায্য করা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সীমান্তপারের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখাও প্রয়োজন।
কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিস্থিতি সামলানোর প্রথম ধাপ মাত্র। স্থায়ী শান্তির জন্য দরকার রাজনৈতিক উদ্যোগ, নিয়মিত আলোচনা এবং সম্প্রদায়গুলির মধ্যে বিশ্বাস পুনর্গঠন। নাগা ও কুকি সমাজের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি অন্যান্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নাগরিক সংগঠন, মহিলা এবং যুবকদেরও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। যাঁরা হিংসায় প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং বাস্তুচ্যুত বা নিরাপত্তাহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানোও সমান জরুরি।
সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথাও ভুললে চলবে না। যাচাই না করা ছবি, গুজব এবং উসকানিমূলক বার্তা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও বিদ্বেষ বাড়াতে পারে। তাই তথ্য যাচাই করে প্রচার করা এবং গুজবের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে প্রশাসনকে স্বচ্ছভাবে তথ্য জানাতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি না ছড়ায়।
মণিপুরের মানুষের কাছে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা।




