• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 18 September, 2026

নিরাপত্তাহীন ত্রাণশিবির

২০২৩ সালের জাতিগত হিংসায় মণিপুরে বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই এখনও ত্রাণ ও পুনর্বাসন শিবিরে

নিরাপত্তাহীন ত্রাণশিবির

২০২৩ সালের জাতিগত হিংসায় মণিপুরে বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই এখনও ত্রাণ ও পুনর্বাসন শিবিরে আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন। ঘর হারানো মানুষের কাছে একটি ত্রাণশিবির কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়— সেটি হওয়ার কথা নিরাপদ আশ্রয়। সেখানে অন্তত প্রাণের নিরাপত্তা, সম্মান এবং ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত থাকবে— এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা একটি রিপোর্ট সেই প্রত্যাশার সামনে অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়া অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিভিন্ন শিবিরে ২৫ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এই ঘটনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কারণ যে মানুষ ইতিমধ্যেই হিংসার কারণে নিজের বাড়ি, সম্পদ, পরিচিত পরিবেশ এবং স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন, আশ্রয়স্থলেও যদি তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে রাষ্ট্রের সুরক্ষার অর্থই বা কী?
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, শিবিরগুলিতে মোট ৬৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নোডাল অফিসার কমিটিকে জানিয়েছেন। তার মধ্যে ৩৪টি মৃত্যুকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সব কটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত হয়নি। ময়নাতদন্ত হয়েছে মাত্র ২০টি ক্ষেত্রে। ২৫টি মৃত্যুর ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং চারটি মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলি নিছক সরকারি নথির সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পিছনে রয়েছে একটি করে মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি অসমাপ্ত জীবন।
সুপ্রিম কোর্ট যথার্থই জানতে চেয়েছে, অস্বাভাবিক মৃত্যুর সব ক্ষেত্রে কেন ময়নাতদন্ত করা হয়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃত্যুর কী কারণ পাওয়া গিয়েছে, সেটিও রাজ্য সরকারকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। এই প্রশ্নগুলির উত্তর দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে পাওয়া জরুরি। কোনও মৃত্যুকেই কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। বিশেষ করে ত্রাণশিবিরে মৃত্যুর ঘটনা হলে তার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত জানতে চেয়েছে, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃতের নিকটাত্মীয়কে মাত্র ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা কেন দেওয়া হয়েছে। প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা কোনও অর্থেই পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণের অর্থ অন্তত রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও সহমর্মিতার একটি স্বীকৃতি। তাই ক্ষতিপূরণে বৈষম্য থাকলে তা দূর করা প্রয়োজন।
মণিপুরের হিংসার ক্ষত এখনও গভীর। বাস্তুচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসন শুধু ঘর তৈরি করে দেওয়ার কাজ নয়; তাঁদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, খাদ্য, শিক্ষা, জীবিকা এবং মানসিক স্বস্তির পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়াও তার অংশ। ত্রাণশিবিরে থাকা মানুষ যেন নিজেদের পরিত্যক্ত বা অসহায় মনে না করেন, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ তাই কেবল প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের জীবনের মর্যাদার প্রশ্ন। মণিপুরের বাস্তুচ্যুত মানুষদের কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বার্তা হওয়া উচিত— তাঁরা একা নন, তাঁদের জীবন মূল্যবান এবং তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতেই দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে