• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 7 August, 2026

বাইশে শ্রাবণের সেই মুহূর্ত

‘প্রতিদিনের মতো সেদিনও আমি নিমতলা শ্মশান ঘাটে ছিলাম। শবদাহ করার কাজে বাবাকে সাহায্য করতাম। তখন আমার বয়েস ষোল কি

বাইশে শ্রাবণের সেই মুহূর্ত

PIC- SNS

‘প্রতিদিনের মতো সেদিনও আমি নিমতলা শ্মশান ঘাটে ছিলাম। শবদাহ করার কাজে বাবাকে সাহায্য করতাম। তখন আমার বয়েস ষোল কি সতেরো। লেখাপড়া শিখিনি। বাইরের খবরও কিছু রাখতাম না। সত্যি বলতে কি রবিঠাকুরের নাম কখনও শুনিনি। সেদিন প্রথম শুনলাম। কিন্তু একটা মানুষের মৃত্যুর জন্য এতো হাহাকার, এতো কান্না ভাবা যায় না। সেদিন অতো লোকের কান্না দেখে বাবার সঙ্গে আমিও কেঁদে ফেলেছিলাম।’
আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে মুনেশ্বর মল্লিকের মুখে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসের সেই দৃশ্য বর্ণনা আজও ইতিহাস হয়ে আছে। এই স্মৃতিচারণা মুনেশ্বর করেছিলেন তাঁর ৬০ বছর বয়েসে। গুরুদেবের শেষযাত্রার শেষ শয্যা রচনার দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন তিনি। ৮৫ বছর আগে সেই ঐতিহাসিক বাইশে শ্রাবণের অন্তিম কর্মের তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বলতে গেলে, মুনেশ্বরের অভিজ্ঞতার কথা অনুভব করলে গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে ওঠে। তাঁর বর্ণনায়, দুপুরের কিছু পরেই শ্মশানে কয়েকজন সাহেব পুলিশ ছুটে এলেন। মুনেশ্বরের বাবার ডাক পড়ল। সঙ্গে মুনেশ্বরও। তখন বাইরে শুধু লোক আর লোক। কিছুক্ষণের মধ্যেই জনস্রোতের চাপে শ্মশানের লোহার গেটটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে গেল। এতো লোক এতো চোখের জল অথচ কোথাও কোনও গন্ডগোল নেই।
আসল ঘটনার সূত্রপাত কবি যখন শেষবার কালিম্পঙে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখন থেকে। এমনিতেই তিনি প্রসটেট সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন। এবার তার কামড়টা একটু বেশিই ছিল। তাই তড়িঘড়ি তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হল। দিনটা ছিল ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই শুক্রবার। সময় বেলা তিনটে হবে। রাখা হল জোড়াসাঁকোর পুরনো বাড়ির দোতলায় তাঁদের সেই পাথরের ঘরে। যাতে বাড়িতে ভিড় না হয়, তার জন্য খবরটাও গোপন রাখা হল। একে অসুস্থ তার উপর দীর্ঘ সময় ট্রেন জার্নিতে কবি এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁকে স্ট্রেচার থেকে নামানো গেল না। স্ট্রেচারে শুয়েই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। রাতে ডাক্তার রাম অধিকারী কবিকে দেখতে এলেন। ভাল করে পরীক্ষানিরীক্ষা করে ওষুধ দিলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, ভয়ের কিছু নেই। একটু দুর্বল হয়ে পড়েছেন তাই এরকম লাগছে। রাতে খুব সাবধানে তাঁকে স্ট্রেচার থেকে তুলে খাটে শোয়ানো হল। সে রাতে বেশ ভালই ঘুমালেন তিনি। পরদিন অর্থাৎ ২৬ জুলাই সকালে খুব স্বাভাবিক লাগলো তাঁকে।
সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ অনেকেই এলেন। গল্পগুজব করলেন। কবিও খুব খুশি। ২৭ এবং ২৮ তারিখ দিনদুটিও মোটামুটি কাটল। এদিকে এই অসুস্থতা থেকে অব্যাহতি পেতে অপারেশন ছাড়া কোনও উপায় নেই। তাই তারই তোড়জোড় শুরু করেছেন পরিবারের লোকজন। গুরুদেবও বললেন, অপারেশন যখন করতেই হবে তখন আর ফেলে না রাখাই ভাল। রোজ গ্লুকোজ ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে তাঁকে। ডাক্তারবাবুরাও তৈরি হচ্ছেন। এই ঘরেই হবে অপারেশন। কিন্তু দেখা গেল অপারেশনের দিন যত এগিয়ে আসছে তিনি ততই বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন। অবশেষে ৩০ জুলাই বেলা ১১টায় অপারেশন শুরু হল। গুরুদেবের মুখের সামনে বুকের উপর একটা ছোট স্ক্রিন দিয়ে ঘেরা হয়েছে যাতে তিনি কিছু দেখতে না পান। মাত্র পঁচিশ মিনিটের অপারেশন শেষ হয়ে যাওয়ার পর ডাক্তারবাবুরা বললেন, তিনদিন না কাটলে কিছু বলা যাবে না। তিনদিন তো কোন ছার, তারপরেও উন্নতির কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। এরই মধ্যে ৫ আগস্ট, বাংলা ২০ শ্রাবণ সন্ধ্যায় ডাক্তার নীলরতন সরকারকে নিয়ে বিধানচন্দ্র এলেন গুরুদেবকে দেখতে। গুরুদেবের কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। রাতে স্যালাইন দেওয়া হল। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হল। সবাই লক্ষ্য করলেন, কবির নাকটা কেমন যেন বাঁদিকে একটু হেলে গেছে। গালদুটো ফুলেছে। বাঁ চোখটা লাল রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। গভীর রাতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটল। ৬ আগস্ট ঠাকুরবাড়ি লোকে-লোকারণ্য। কয়েকদিন ধরেই ভিড় চলছিল। সেদিন আর ঠেকিয়ে রাখা গেল না। ৭ আগস্ট, ১৯৪১ সাল ২২ শ্রাবণ ভোর থেকে জোড়াসাঁকোর সরু গলিতে গাড়ির লাইন পড়ে গেল। গুরুদেবকে  তখন অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ডাক্তারবাবুরা হঠাৎ বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা আবার পরামর্শে বসলেন। কিন্তু কোনও কাজ হল না। এবার কবিকে কোরামিন ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। ভোর থেকেই ব্রহ্মসংগীত চলছিল। আত্মীয়-পরিজনেরা কবির শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে। কবির নাতবউ অমিতা ঠাকুর পলতে করে তাঁর মুখে জল দিলেন। চিনা ভবনের তান সাহেব নিরবে পদ্মবীজের মালা জপ করছেন। কবিকক্ষে তখন পিনপতন নীরবতা।
অবশেষে ওইদিন বেলা প্রায় ১২টার কিছু পরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ কন্ঠে কবি যেন বলে উঠলেন, ‘সব শেষ’। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এর পরেই কবির প্রয়াণ ঘটে। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। মুহূর্তে সারাদেশে কবির মৃত্যুর খবর রটে গেল। এবার গন্তব্য নিমতলা মহাশ্মশান। কবিকে কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবীতে সাজানো হল। কপালে চন্দন। গলায় গোড়ে মালা। দু’পাশে শ্বেতকমল আর রজনীগন্ধায় ঢাকা। শ্মশান চত্বরে তখন তৎপরতা তুঙ্গে। কবির শেষ শয্যা রচনার জন্য বাবার সঙ্গে মুনেশ্বরও মাথায় করে চন্দনকাঠ বইলেন। পরম যত্নে প্রস্তুত হল সেই শয্যা। কিন্তু তারপর যা দেখা গেল তা কল্পনাতীত। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। সূর্যাস্তের আর বেশি বাকি নেই। কিছু দূরে দেখা গেল সে এক বিশাল মিছিল তার সঙ্গে সাদা রঙের রথের মত কী একটা এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই জনজোয়ার এসে আছড়ে পড়ল শ্মশানে। সঙ্গে সাদা চাদর আর ফুলে ফুলে ঢাকা কবির নিথর দেহ। পিছনে গঙ্গায় সারিসারি নৌকা জুড়ে দাঁড়ানোর জায়গা তৈরি হয়েছে। সেখানেও লোকে-লোকারণ্য। এত ভিড়ে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ পর্যন্ত শ্মশানে পৌঁছতে পারলেন না। শেষে সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে হাওড়া দিয়ে নৌকায় নিমতলা ঘাটে এসে কবির মুখাগ্নি করলেন। বিশ্বকবির শেষ যাত্রার ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তিনি মহাশ্মশান থেকে বেতার ভাষ্যে বলেছিলেন, ‘জাতীয় সম্পদ আজ হারিয়ে গেল। কবি শুয়ে আছেন চন্দন কাঠের চিতার উপর। গঙ্গার গৈরিক স্রোত বয়ে চলেছে। ওপরের আকাশ ভুবনকে ঢেকে ফেলেছে। মনে হয় তিনি এরকম পরিবেশেই বিদায় নিতে চেয়েছিলেন…।’
(সূত্র : গুরুদেব— রাণী চন্দ্র৷

যুগান্তর সাময়িকী, দৈনিক বসুমতী।)