• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 6 August, 2026

পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন শান্তিনাথ শিব মন্দির

শ্রাবণ আর চৈত্র মাস শিব ভক্তদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইসময় দূর দূরান্ত থেকে শিব ভক্তগণ দেবাদিদেব মহাদেবের মাথায় জল

পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন  শান্তিনাথ শিব মন্দির

PIC- X

শ্রাবণ আর চৈত্র মাস শিব ভক্তদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইসময় দূর দূরান্ত থেকে শিব ভক্তগণ দেবাদিদেব মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে আসেন। এমনই এক বহু শতাব্দী প্রাচীন শৈবতীর্থের কাহিনি শোনানো যাক৷ যে মন্দিরের চাতালে মা সারদা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তাঁকে তাঁর পছন্দের পাত্র হিসাবে বিবেচিত করেন।
হুগলি জেলার কামারপুকুর ও দেরেগ্রামকে পিছনে ফেলে আরও বেশ কিছুটা অগ্রসর হলে শিহর গ্রাম। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভাগ্নে হৃদয়ের বাড়ি এখানে। এই গ্রামে প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো এক শিব মন্দির অবস্থিত৷ মন্দিরটি ভক্তদের কাছে শান্তিনাথ শিব মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরটি প্রাচীনত্বের দিক থেকে যেমন উল্লেখযোগ্য, ঠিক তেমনইভাবে এই মন্দির চাতাল ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব ও মা সারদার পদধূলিধন্য৷
বর্তমানে যে স্থানে মন্দির অবস্থিত, অনেককাল আগে সেখানে ছিল গোঁয়াই গাছের জঙ্গল৷ এই জঙ্গলের মধ্যে একটা উঁচু উইঢিপি ছিল। কথিত আছে যে, রাখালরা সেই জঙ্গলে গরু চরাতে যেত। তখন মাঝেমাঝেই তাদের নজরে আসতো গরুর পাল বাড়ি ফেরার আগে আসন্ন প্রসবা একটা গরু সেই উইঢিপির ওপর দুধ ঢেলে আসত। রাজামশাইকে এসে তারা সেই খবর জানায়। তারা এটাও জানায় যে, গরুটি যে স্থানে দুধ দেয়, সেই একই জায়গায় একজন সন্ন্যাসী প্রতিদিন সেখানে সাধনা করেন। তিনিও ওই ঢিপির ওপর পাঁচ ফলকযুক্ত বেলপাতা রেখে যান। রাখালদের কাছ থেকে এই খবর পাওয়ার পরই কৌতূহলবশত লোকলস্কর নিয়ে রাজা সেই স্থানে উপস্থিত হন৷ উই ঢিপি খনন করার পর তার ​নিচ থেকে আবিষ্কৃত হয় এক শিবলিঙ্গ। এই শিবলিঙ্গ যেহেতু সকলের শন্তিবিধান করে, তাই তাঁর নাম হয় শান্তিনাথ। সন্ন্যাসী শান্তিনাথের পুজোর দায়িত্ব পান। কিন্তু, তার কোনও উত্তরাধিকারী ছিল না, তাই তিনি মারা যাওয়ার পর রাজা চিন্তিত হয়ে পড়েন পরবর্তী সেবায়িত হিসাবে কাকে নিযুক্ত করা যায় সেই বিষয়ে।
তখন এই অঞ্চল ছিল বর্ধমানের রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন৷ একদিন শান্তিনাথের স্বপ্নাদেশ পান মহারাজা। স্বপ্নে তিনি জানতে পারেন যে, পুবপাড়ায় আঠেরো ঘর ব্যানার্জি পরিবার ব্রাহ্মণের বাস। এই গ্রামে কিছুদিনের মধ্যেই মহামারী কলেরা রোগ হানা দেবে৷ সেই মহামারী রোগে সতেরো ঘর ব্যানার্জি পরিবারের মৃত্যু ঘটবে, বেঁচে থাকবেন মাত্র একঘর ব্যানার্জি পরিবার৷ তাঁরাই বংশপরম্পরায় নিযুক্ত হবেন বাবার পরবর্তী সেবায়েত হিসাবে। শান্তিনাথের স্বপ্নাদেশ মতো বাস্তবক্ষেত্রে তাই হলো। একমাত্র যে ব্যানার্জি পরিবার জীবিত ছিলেন, তাঁরাই শান্তিনাথের পুজোর অধিকার লাভ করলেন। বর্ধমানরাজ তাঁদের নিষ্কর জমি দান করলেন৷ ৩০ ফুট উচ্চতার এই সুপ্রাচীন দেউল মাকড়া পাথরের শিখর দেউল রীতিতে নির্মিত হলো। বাঁকুড়া জেলার কোতলপুর থানার দক্ষিণে অবস্থিত এই মন্দির বাঁকুড়া জেলার মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম স্থাপত্যকীর্তি বলে বিবেচিত হয়৷
যাইহোক, পূর্ব প্রসঙ্গের আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক। ব্যানার্জি পরিবারের সেবাইতদের রাজা ‘রাজচক্রবতী’ উপাধি প্রদান করলেন। পরবর্তীকালে সেই রাজচক্রবর্তী সংক্ষিপ্ত রূপ পেলো চক্রবর্তী। মন্দিরের বর্তমান সেবাইতের কাছ থেকে জানা গেলো যে, ১৮১৭ সালে নফর চক্রবর্তীর কাছ থেকে পাওয়া দলিলে এই মন্দির সংলগ্ন বিশাল এলাকাকে নিষ্কর সম্পত্তি হিসাবে উল্লেখ করা রয়েছে। তবে এই দলিল তৈরি হওয়ারও অনেক আগে থেকেই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা বলে সেবাইতের দাবি।
মন্দির সংলগ্ন এক সুবিস্তৃত চাতাল। অদূরে দক্ষিণপাড়াতে ঠাকুর রামকৃষ্ণের বোনের বাড়ি ছিল। কথিত আছে যে, একবার গাজন মেলার সময় তিনি সেখানে এসেছিলেন। সেখান থেকে এই মন্দির সংলগ্ন চাতালে তিনি রাম যাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে মা সারদার মা শ্যামাসুন্দরী দেবীর বাড়ি ছিল উত্তরপাড়াতে। এই গাজন মেলা উপলক্ষে মায়ের সঙ্গে মা সারদা মামারবাড়িতে এসেছিলেন বলে শোনা যায়। সেইসময় গাজন মেলা আর রামযাত্রা দেখতে সখীদের সঙ্গে শান্তিনাথ শিব মন্দির চাতালে এসেছিলেন সারদা দেবী৷ সখীরা রামযাত্রার শিল্পীদের নির্দেশ করে কৌতুক ভরে তাঁর কাছ থেকে জানতে চাইলেন যে তিনি কাকে বিয়ে করতে চান? সারদা দেবী সখীদের প্রশ্নের উত্তরে গদাধরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে নির্দ্বিধায় জানান যে তিনি তাঁকেই বিয়ে করতে চান৷ মা সারদার এই সারল্য দেখে সখীরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি শুরু করে দেন। কিন্তু মা যে কতখানি ভবিষ্যতদ্রষ্টা ছিলেন সে কথা আমরা মায়ের পরবর্তী জীবনেই দেখতে পাই। পরবর্তীকালে ঠাকুর রামকৃষ্ণর সঙ্গেই বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন মা সারদা।
এখনও সেই পুরনো রীতি অনুসরণ করে প্রতিবছর এখানে মহাসমারোহে গাজন মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেইসময় বেশ কয়েকদিন ধরে এখানে যাত্রাপালাও হয়ে থাকে। এই উপলক্ষে দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। শ্রাবণ মাসেও এখানে প্রচুর ভক্তরা বাবার মাথায় জল ঢালতে আসেন। মন্দিরের বর্তমান সেবাইত এই প্রসঙ্গে জানালেন যে, একবার অর্থের অভাবে গাজন মেলার যাত্রাপালা বদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল৷ তখন শান্তিনাথ তৎকালীন সেবাইতকে চিন্তা করতে বারণ করেন এবং জানান যে যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবেই।
গাজন মেলার দিন যথাসময়ে যাত্রা শিল্পীরা উপস্থিত। তৎকালীন সেবাইত তাঁদের দেখে অবাক হয়ে যান। যাত্রাশিল্পীরা বলেন যে, তিনি কিছুদিন আগেই তো তাঁদের যাত্রার জন্য বায়না দিয়ে এসেছেন৷ সেবায়েত মনে মনে অনুভব করেন যে, শান্তিনাথ সেবায়েতের রূপ ধরে যাত্রাশিল্পীদের বায়না দিয়ে এসেছেন৷ মহাসমারোহে গাজন মেলায় অন্যান্যবারের মত সেবারও যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এইভাবেই শান্তিনাথের নানারকম অলৌকিক কাণ্ডকারখানার সাক্ষী এলাকাবাসী।
মন্দিরে প্রতিদিন দু’বার শান্তিনাথের নিত্যসেবা হয়ে থাকে— সকাল ন’টার সময় বাবার উদ্দেশে আরতি হয় আর সন্ধ্যে সাতটায় সন্ধারতির সঙ্গে সঙ্গে শীতল নিবেদিত হয় বাবার উদ্দেশে। প্রতিদিন সকালে মন্দিরে দরজা খোলা হয়৷ রাত ন’টায় মন্দির বদ্ধ হয়৷
হাওড়া-গোঘাট লোকালে গোঘাট স্টেশনে নেমে বাসে বা টোটো রিজার্ভ করে পাঁচশতাব্দী প্রাচীন