নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে ঘিরে আইনি টানাপোড়েন আরও তীব্র হল। খেজুরি থানার ২০০৭ সালের ৪৫ নম্বর এফআইআর-এ মিলন প্রধানকে গ্রেফতার দেখানোর সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত সিঙ্গেল বেঞ্চের নির্দেশ বৃহস্পতিবার খারিজ করে দিল প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ।
সিঙ্গেল বেঞ্চের নির্দেশ নিয়ে শুনানিতে একাধিক কঠোর প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর প্রশ্ন, “আমি বিস্মিত হচ্ছি যে কীভাবে সিঙ্গেল বেঞ্চ এই নির্দেশ দিল?” একইসঙ্গে জানতে চাওয়া হয়, “কোন আইনের বলে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল সিঙ্গেল বেঞ্চ?”
ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের নির্দেশ একদিনের জন্যও বহাল থাকতে পারে না। মিলন প্রধানের আইনজীবীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, “কীভাবে এই ধরনের নির্দেশ ছিনিয়ে আনলেন?”
শুনানিতে আরও বলা হয়, গ্রেফতার হলে সংশ্লিষ্ট আদালতে জামিনের আবেদন করতে হবে এবং গ্রেফতারের আগে প্রয়োজন হলে আগাম জামিনের আবেদন করতে হয়—আইনি প্রক্রিয়া সেভাবেই চলে। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, আইন সবার জন্য সমান। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলে কোনও বিশেষ সুবিধা দেওয়া যায় না।
আইনি প্রক্রিয়া আটকে রেখে এমন অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা দেওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করে ডিভিশন বেঞ্চ। মিলন প্রধানের আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য্যের উদ্দেশ করে প্রশ্ন ওঠে, “এভাবে আপনি আইনি প্রক্রিয়ার শ্বাসরোধ করতে পারেন না।”
মিলনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানার উল্লেখ রাজ্যের
রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে জানান, মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। রাজ্যের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলা রয়েছে।
রাজ্যের দাবি, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হয়। সেই প্রক্রিয়াতেই ১৮ সেপ্টেম্বর মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়। পরে অন্যান্য মামলাতেও তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
মিলন প্রধান বর্তমানে হলদিয়া সংশোধনাগারে রয়েছেন বলে আদালতে জানানো হয়েছে। খেজুরি থানার একটি মামলায় তাঁকে আদালতে পেশ করার পর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
‘নির্বাচনে লড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না’—মিলন প্রধানের আইনজীবির।
অন্যদিকে মিলন প্রধানের আইনজীবীর বক্তব্য, তাঁর মক্কেল একজন সাধারণ মানুষ এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার গণতান্ত্রিক অধিকার তাঁর রয়েছে। মনোনয়নপত্রে হলফনামার মাধ্যমে মামলাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
মিলনের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়, ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি মামলাগুলিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার আবেদন করা হয়।
তাঁর পক্ষের আরও দাবি, প্রথমে তিনি জানতে চেয়েছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে মোট কতগুলি মামলা রয়েছে। আদালতে রাজ্যের বক্তব্যের পর সংখ্যাটি সাত বলে জানা যায়। এই তথ্য আগে সিঙ্গেল বেঞ্চে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি বলেও মিলনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়।
‘৬ নির্বাচন, ১২ গণনা,তারপর মামলার গুরুত্ব বিবেচনা হোক’
মিলন প্রধানের পক্ষ থেকে আদালতে আবেদন করা হয়, নির্বাচনের সুযোগ যেন তাঁকে দেওয়া হয়। ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষ হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির গুরুত্ব ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ বিবেচনা করার আবেদনও করা হয়।
তবে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকলে শুধুমাত্র তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—এই কারণে আইনি প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখা যায় না।
রাজ্যের দাবি,পুরনো মামলা প্রত্যাহারের নেপথ্যে ছিল ‘প্রভাবশালী’ পরিচয়
শুনানিতে রাজ্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অতীতে মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে থাকা কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। রাজ্যের বক্তব্য, তৎকালীন সরকারের আমলে তাঁর প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে মিলনের পক্ষ থেকে ২০০৭ সালের মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করার বিষয়টি তুলে ধরে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়।
ডিভিশন বেঞ্চে প্রশ্নের মুখে সিঙ্গেল বেঞ্চের নির্দেশ….
২১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের সিঙ্গেল বেঞ্চ ১২ অক্টোবর পর্যন্ত মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বরের আরেক নির্দেশে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশও খারিজ করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই ডিভিশন বেঞ্চে যায় রাজ্য। বৃহস্পতিবার শুনানিতে সিঙ্গেল বেঞ্চের নির্দেশের আইনি ভিত্তি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ।




