• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 22 August, 2026

ফিফা কি ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কাগজে-কলমে একটি অলাভজনক ও স্বায়ত্তশাসিত ক্রীড়া সংগঠন, যার ছাতার নিচে রয়েছে বিশ্বের ২১১টি

ফিফা কি ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য

Photo: X

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কাগজে-কলমে একটি অলাভজনক ও স্বায়ত্তশাসিত ক্রীড়া সংগঠন, যার ছাতার নিচে রয়েছে বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশ। মাঠের ফুটবল যেখানে কোটি-কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও ঐক্যের প্রতীক, সেখানে জুরিখের (সুইজারল্যান্ড) সদর দপ্তর থেকে পরিচালিত এই সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্ব ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রতীক হয়ে উঠছেন। এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির কাজ হওয়ার কথা ছিল ফুটবলের স্বার্থ রক্ষা করা, খেলাটির প্রসার ঘটানো এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে আরও গণমুখী ও আকর্ষণীয় করে তোলা। বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দীর্ঘকালীন মেয়াদে ফিফার চরিত্র রূপ নিয়েছে এক কর্পোরেট সাম্রাজ্যে, যেখানে ফুটবলের মূল চেতনার চেয়ে ব্যক্তিপূজা ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা প্রকট। ইনফান্তিনো  সুইজারল্যান্ড ও ইতালির দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন। ২০১৬ সালে ফিফার সভাপতি হওয়ার পর এক দশক ধরে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে। ২০২৬ সালের মে মাসে তিনি ঘোষণা করেছেন, ২০২৭ সালে আবার সভাপতি পদে নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হবেন। অর্থাৎ, এক দশকের পর আরও দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ব ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর স্পষ্ট। ফিফার ২১১ সদস্য সংস্থার সমর্থন তাঁর রাজনৈতিক শক্তির
মূল ভিত্তি।
এই ক্ষমতার সঙ্গে যে আর্থিক সুবিধা জড়িয়ে আছে, সেটিও কম বিস্ময়কর নয়। ফিফার ২০২৫ সালের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী ইনফান্তিনোর মূল বার্ষিক বেতন প্রায় ৬০ লক্ষ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। এর পাশাপাশি ফিফা তাঁর বাসস্থান, অফিসিয়াল গাড়ি, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বিমা, সরকারি সফরের সব খরচ, নির্ধারিত হারে ভ্রমণ ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বহন করে।
এত অর্থ, এত ক্ষমতা, এত আন্তর্জাতিক প্রভাব, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, একজন ক্রীড়া প্রশাসক নিজেকে কি রাষ্ট্রপ্রধানের মতো ভাবতে শুরু করেছেন? ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এখন আর গোপন বিষয় নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ফিফা প্রথমবার ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করেছে৷ সেই পুরস্কারটি ইনফান্তিনো নিজের হাতে  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। পুরস্কার প্রদানের সময় ট্রাম্পকে একজন মহান নেতা হিসেবে প্রশংসা করেন। তিনি আরও জানান ট্রাম্পের পাশে তিনি সবসময় আছেন ও থাকবেন।
এটাই চরম আপত্তির জায়গা৷ ফিফা কোনও রাজনৈতিক সংগঠন নয়। তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কথা। অথচ একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে ফিফার নিজস্ব উদ্যোগে শান্তি পুরস্কার দেওয়া এবং সেই রাষ্ট্রপ্রধানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্যে ভূয়সী প্রশংসা, ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ‘ফেয়ার স্কোয়ার’ নামের একটি অলাভজনক  মানবাধিকার সংগঠন ফিফার নৈতিকতা কমিটির কাছে অভিযোগও করেছে যে, এই ঘটনায় ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘিত হতে পারে।
কেন এই ঘনিষ্ঠতা? কেবল বন্ধুত্বের জন্য? নাকি এর পিছনে রয়েছে ক্ষমতার হিসাব?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক ‘বিশ্বকাপ বিক্রি’ পরিকল্পনার পর।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ফিফা একটি নতুন বাণিজ্যিক সংস্থা— ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফইই) গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। প্রস্তাব ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নে এই সংস্থার ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ৪.২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা। এর আওতায় বিশ্বকাপ ও অন্যান্য প্রতিযোগিতার সম্প্রচার, স্পনসরশিপ, টিকিট ও লাইসেন্স-সহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পদ থাকার কথা ছিল। এইপ্রসঙ্গে বলি, আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯০৪ সালের
২১ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে  ১২২ বছরের ইতিহাসে এইপ্রথম ফিফার একটি অংশ বেসরকারি মালিকানায় চলে যেত। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন জশুয়া কুশনার। যিনি ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’ নামক একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক। জশুয়া কুশনার হলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। অর্থাৎ, ফিফার সবচেয়ে মূল্যবান বাণিজ্যিক সম্পদকে বেসরকারি পুঁজির কাছে উন্মুক্ত করার পরিকল্পনায় সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছিল ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি ব্যবসায়িক বৃত্ত। ফিফা অবশ্য বলেছিলেন, এটি সরাসরি ফিফা বিক্রি নয়, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা কেবল একটি ফিফা-নিয়ন্ত্রিত সহযোগী সংস্থার সংখ্যালঘু অংশীদার হতেন এবং নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতেই থাকতো। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন, ফিফার বিশ্বকাপের মতো সম্পদে বেসরকারি পুঁজির প্রবেশের দরজা খুলতে হবে কেন? আর ২১১টি সদস্য সংস্থার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ছাড়াই এতবড় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হল কেন?
প্রতিবাদ শুরু হতেই উত্তরটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইউনিয়ন অফ ইউরোপিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনস, যা ইউরোপে ফুটবল পরিচালনা করে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন, যা এশিয়ায় ফুটবল পরিচালনা করে, কনফেডারেশন অফ নর্থ, সেন্ট্রাল আমেরিকা অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল-সহ গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থাগুলি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানায়। ইউইএফএ হুমকি দেয়, বেসরকারি মালিকানার এই পরিকল্পনা পুরোপুরি প্রত্যাহার না হলে তাদের সদস্য দেশগুলি ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কট করতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রবল চাপের মুখে পড়ে ইনফান্তিনো পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করেন। তিনি বলেছেন, ‘ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত করার লক্ষ্য আমাদের সবসময়ই ছিল এবং থাকবে।যার ফলে এই প্রস্তাব আর এগোবে না।’ কিন্তু প্রশ্নটি কি এখানেই শেষ? একেবারেই নয়। কারণ, আপত্তি শুধু একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নয়, আপত্তি ফিফার পরিচালন পদ্ধতি নিয়েই। ফুটবল কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ২১১টি দেশের কোটি কোটি মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একজন সভাপতির ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও পছন্দের ওপর নির্ভর করবে? ইনফান্তিনো বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য ফুটবলের উন্নয়ন। ২১১টি সদস্য সংস্থাকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার যুক্তিও সামনে এসেছে। কিন্তু ফুটবলের উন্নয়নের নামে ফুটবলের বাণিজ্যিক সম্পদকে ক্রমশ আর্থিক বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া কি সত্যিই উন্নয়ন? নাকি এটি ফুটবলকে আরও বড় কর্পোরেট পণ্যে পরিণত করার পথ?
সবচেয়ে বড় কথা, ফিফার সভাপতি কোনও রাষ্ট্রপ্রধান নন। তাঁর হাতে কোনও দেশের জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। তিনি ২১১টি সদস্য সংস্থার নির্বাচিত প্রশাসক মাত্র। তাঁর দায়িত্ব ফুটবলকে শাসন করা নয়, ফুটবলের সেবা করা।
তাই তাঁর সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হওয়া উচিত— আর কতদিন ক্ষমতায় থাকবো, তা নয়; ফুটবলকে কতটা স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও জনমুখী  রেখে যেতে পারব, সেটি। ফিফার সভাপতি যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে নিজের প্রভাব বাড়াতে চান, যদি রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাকে সাংগঠনিক স্বার্থের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেন, যদি বিশ্বকাপের মতো জনসম্পদকে বেসরকারি পুঁজির কাছে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তবে প্রতিবাদ হবেই।
ফিফা ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বিশ্বকাপও নয়। বিশ্বফুটবল কোনও সভাপতির ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়। ফুটবল-মাঠে খেলোয়াড়ের ঘাম, গ্যালারিতে দর্শকের উন্মাদনা, পাড়ার মাঠে কিশোরের স্বপ্ন এবং পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের গভীর ভালোবাসায় বেঁচে থাকে। ফুটবলের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে ক্ষমতার একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা ও বাণিজ্যিক লিপ্সা থেকে বৈশ্বিক ফুটবল প্রশাসনকে অবিলম্বে মুক্ত করা জরুরি। বিশ্বফুটবলের ওপর কোনও এক ব্যক্তির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার ছায়া পড়তে দেওয়া যায় না। ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের লড়াই তাই শুধু একজন সভাপতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের
লড়াই নয়।
এটি আসলে নির্ধারণ করবে— ফিফা ফুটবলের প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে পরিণত হবে ক্ষমতা, অর্থ ও ব্যক্তিগত প্রভাবের এক বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্যে? বিশ্বফুটবল আজ সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।