• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 21 August, 2026

সমাবর্তনের মঞ্চে প্রশ্ন: বিচারব্যবস্থা, প্রতিবাদ ও তরুণদের আস্থা

ভারতের আইনশিক্ষার জগতে সমাবর্তন সাধারণত গর্বের মুহূর্ত। দীর্ঘ পড়াশোনা, পরীক্ষা, ইন্টার্নশিপ এবং নানা প্রতিযোগিতার পর একজন

সমাবর্তনের মঞ্চে প্রশ্ন: বিচারব্যবস্থা, প্রতিবাদ ও তরুণদের আস্থা

PIC-X

ভারতের আইনশিক্ষার জগতে সমাবর্তন সাধারণত গর্বের মুহূর্ত। দীর্ঘ পড়াশোনা, পরীক্ষা, ইন্টার্নশিপ এবং নানা প্রতিযোগিতার পর একজন শিক্ষার্থী যখন আইনজীবী হওয়ার পথে পা রাখেন, তখন দেশের প্রধান বিচারপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির হাতে ডিগ্রি নেওয়াকে অনেকেই সম্মানের বলে মনে করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বিতর্ক সেই প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দেশের দুই নামী আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের একাংশ চাইছেন না, ভারতের প্রধান বিচারপতি তাঁদের সমাবর্তনের প্রধান অতিথি হন। কেন?
বিষয়টি শুধু একজন বিচারপতিকে ঘিরে ছাত্রদের অসন্তোষের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধ, প্রতিবাদের অধিকার, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা এবং ক্ষমতাবানদের বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব— এই সবকিছুর প্রশ্ন। তাই এই বিতর্ককে ব্যক্তিগত বিরোধের চেয়ে বড় করে দেখা দরকার।
ঘটনার সূত্রপাত একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে। প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের একটি অংশ সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশিত হয়, যেখানে বেকার ও কর্মহীন কিছু তরুণকে ‘আরশোলা’ বা ‘পরগাছা’-র মতো শব্দ দিয়ে উল্লেখ করার অভিযোগ ওঠে। পরে প্রধান বিচারপতি জানান, তাঁর বক্তব্যকে প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি আসলে ভুয়ো বা বেআইনি ডিগ্রিধারী কিছু মানুষের কথা বলেছিলেন। কিন্তু জনপরিসরে একবার কোনও শব্দ ছড়িয়ে পড়লে তার অভিঘাত থামানো কঠিন। বিশেষত যে সময়ে দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ বেকারত্ব, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার সঙ্গে লড়ছেন, তখন এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
এই ক্ষোভ থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলনের জন্ম হয়েছে বলে সংবাদে উঠে এসেছে। নামটি নিজেই দেখিয়ে দেয়, তরুণরা কীভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তির মন্তব্যকে প্রতিবাদের ভাষায় ফিরিয়ে দিতে পারে। এটি হয়তো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমের যুগে এমন প্রতীকী আন্দোলনের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় দিল্লিতে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা বলপ্রয়োগ করেছে। শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি অংশের কাছে প্রশ্নটি তখন আর শুধু একটি মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁদের মনে হয়েছে, নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার এবং পুলিশের আচরণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও বিচারব্যবস্থা যথেষ্ট দ্রুত সাড়া দিচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে নালসার ইউনিভার্সিটি অব ল-এর একদল শিক্ষার্থী প্রধান বিচারপতিকে সমাবর্তনের প্রধান অতিথি না করার অনুরোধ জানান। তাঁদের যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বলতে চেয়েছেন, আইন পড়ার সময় তাঁরা ন্যায়, অধিকার, সংবিধান এবং নাগরিক স্বাধীনতার যে মূল্যবোধ শিখেছেন, তার সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগকে উপেক্ষা করার মতো কোনও ধারণা যেন না মেলে। পরে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন যে, তিনি আবেদন শুনতে অস্বীকার করেননি, বরং আবেদনটি যথাযথভাবে দাখিল করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ছাত্রদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসে গেছে।
এখানে আরেকটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার এক শীর্ষ কর্মকর্তা নালসারের ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এবং তাঁদের আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্তি আটকে দেওয়ার হুমকি দেন। এই হুমকি মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। কারণ, কোনও প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা একজন অতিথিকে নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন— এটি মূলত মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের বিষয়। তার জন্য পেশাগত ভবিষ্যৎ আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলে তা প্রতিবাদের অধিকার সম্পর্কে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
পরে সেই হুমকি প্রত্যাহার করা হয় এবং ক্ষমাও চাওয়া হয়। কিন্তু এই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলো সমালোচনার মুখে পড়লে তাদের প্রতিক্রিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণের প্রতিবাদ ভুল হতে পারে, ভাষা তীব্র হতে পারে, সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু তার উত্তর যদি হয় শাস্তির ভয়, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়।
বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরাও পরে এই বিতর্কে সংহতি জানান। তাঁরা শুধু বার কাউন্সিলের কর্মকর্তার মন্তব্যের বিরোধিতা করেননি, প্রধান বিচারপতিকে সমাবর্তনে আমন্ত্রণ না জানানোর দাবির প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন। এর অর্থ, ঘটনাটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পেরিয়ে আইন পড়ুয়াদের বৃহত্তর অংশের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে এখানে একটি সতর্কতার জায়গাও আছে। কোনও বিচারপতির বক্তব্য নিয়ে ছাত্রদের ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং বিচারকের পদমর্যাদাও গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আদালতের কোনও সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য অপছন্দ হলেই বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক পক্ষপাতের যন্ত্র হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। একইভাবে বিচারকদেরও মনে রাখতে হয়, তাঁদের প্রতিটি প্রকাশ্য মন্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একজন সাধারণ নাগরিকের কথার সঙ্গে প্রধান বিচারপতির কথার সামাজিক অভিঘাত এক নয়।
এই কারণেই সমাবর্তনের প্রধান অতিথি নিয়ে বিতর্কটি আসলে প্রতীকের লড়াই। ছাত্ররা প্রশ্ন তুলছেন— যাঁদের কাছ থেকে তাঁরা ন্যায়বিচারের আদর্শ শিখেছেন, তাঁদের কাছে তাঁরা কী ধরনের মূল্যবোধ দেখতে চান? অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার মর্যাদা মনে করিয়ে দেয় যে, আবেগের পাশাপাশি প্রক্রিয়া, প্রমাণ এবং আইনের শাসনও জরুরি।
সবশেষে, এই ঘটনাকে ছাত্র বনাম বিচারপতি, কিংবা সরকার বনাম বিরোধী পক্ষ— এই সরল দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনা উচিত নয়। আসল প্রশ্ন আরও গভীর– দেশের তরুণ নাগরিকেরা কি তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে নিরাপদ বোধ করছেন? তাঁরা কি মনে করছেন, তাঁদের কথা শোনা হচ্ছে? এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা কি সমালোচনাকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত?
আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন কেবল ডিগ্রি পাওয়ার অনুষ্ঠান নয়। এটি ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের কাছে সংবিধান, ন্যায় এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক। তাই সেই মঞ্চে কে প্রধান অতিথি হবেন, তা নিয়ে ছাত্রদের প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়। বরং একটি সুস্থ গণতন্ত্রে এমন প্রশ্নই প্রমাণ করে যে, তরুণেরা শুধু আইন মুখস্থ করতে চান না, তাঁরা আইনের আত্মাটিও বুঝতে চান।
এই বিতর্কের শেষ কোথায়, তা সময়ই বলবে। কিন্তু একটি শিক্ষা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট– ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হলো সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা। আর তরুণদের জন্য গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে— প্রতিবাদ করা যেমন অধিকার, তেমনই যুক্তি, তথ্য ও আইনের পথ ধরে প্রতিবাদ করাও দায়িত্ব।