• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 13 June, 2026

‘সাংকেতিক’-এর নতুন প্রযোজনা ‘বিপন্ন বিস্ময়’

শশী গুহ এই নাটকের নির্দেশক। তিনি ৬টি অন্তরঙ্গ নাটককেই ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। মঞ্চসজ্জাও এই ব্যতিক্রমী প্রযোজনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নিজস্ব চিত্র

দেবপ্রিয় বাগচী

“জানি— তবু জানি/ নারীর হৃদয়— প্রেম— শিশু— গৃহ– নয় সবখানি; / অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—/ আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/ খেলা করে;/ আমাদের ক্লান্ত করে/ ক্লান্ত— ক্লান্ত করে।” কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার এই সারাৎসার ঘুরেফিরে আসে প্রখ্যাত নাট্যকার তড়িৎ মিত্রের লেখা ৬টি ছোট নাটকের সমন্বয় ‘বিপন্ন বিস্ময়’-এ। এই প্রযোজনা কোনও একটি একক গল্প নয়। বলা যায়, এটি ভাঙনের একটি কোলাজ। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাঙনের মুখোমুখি এই সময়, সমাজ এবং মানুষকে দাঁড় করিয়েছেন নাট্যকার।

প্রথম নাটক ‘শয়তানের স্বীকারোক্তি’, এতে একক অভিনয় করেছেন দেবজিৎ ব্যানার্জি। এই নাটকের একক মানুষটি ফাউস্টের বন্ধু হিসেবে যেন জীবনের সীমানা পেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাটকের শুরুতেই তিনি স্বাগত জানান দর্শকদের। কিন্তু সেই স্বাগত কোনও উষ্ণ আহ্বান নয়, তা এক শীতল উপলব্ধি। এই সমাজের অবক্ষয়, সম্মান রক্ষার নামে হত্যা করার মতো অপরাধ এবং আমাদের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা— এসব নিয়েই তিনি প্রশ্ন তোলেন, আমরা কি শুধুই দর্শক, নাকি এই অপরাধের অংশীদার?

দ্বিতীয় নাটক ‘প্রেম অথবা প্রতিহন্তা’। এখানে প্রেমের অন্তর্গত হিংসার অনুসন্ধান উঠে আসে– এক যুবকের আকাঙ্ক্ষা ও অক্ষমতার ভেতর সেই যুবকটি পৌঁছতে পারেনি তার প্রেমিকার কাছে। শেষ পর্যন্ত তার অবদমিত আবেগ পরিণত হয় হত্যায়। একটি পার্কে এক তরুণীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই যুবকের স্বীকারোক্তি থেকে উঠে আসে সেই সঙ্কট, যেখানে অস্পষ্ট হয়ে যায় প্রেম ও অধিকারবোধের সীমারেখা। প্রেম কখন হয়ে ওঠে হিংসাত্মক এবং যার পরিণতি ডেকে আনে হত্যা— এই প্রশ্ন উঠে আসে নাটকের অন্তরাল থেকে। এই নাটকে অভিনয়ে করেছেন, ঋত ব্যানার্জি ও বর্ষা ভট্টাচার্য।

তৃতীয় নাটক ‘অন্তক’। একটি রেস্তোরাঁর পাবে এক যুবকের মুখোমুখি এক নারী, যে আসলে মৃত্যু। ওই যুবকটি নিজেকে নারীবাদী হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চাইলেও তাঁর কাজকর্মের মধ্যে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে না। এখানে যুবকটি মুখোশ পরিহিত। আর এই মুখোশের আড়ালে থাকা তার সমস্ত ভণ্ডামিকে উন্মোচন করতে থাকে সেই মৃত্যুর প্রতীক নারীটি। এই নারীর সংলাপে এবং প্রশ্নে উঠে আসে সমাজে নারীর প্রতি অবিচার। নারীবাদের নামে কথা ও কাজের নানান অসঙ্গতি প্রতিফলিত হয় এই নাটকে। নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুপ্রিয়া রায়চৌধুরী এবং মুখোশ পরিহিত নির্বাক যুবকের ভূমিকায় অর্পণ মল্লিক।

চতুর্থ নাটক ‘খণ্ডিত মাথা অথবা ভবিষ্যৎ’। এই নাটকে উঠে আসে দুই প্রজন্মের সংঘর্ষ। দুই চরিত্রের মধ্যে একজন বৃদ্ধ, যিনি নিজের মধ্যে বহন করছেন ঐতিহ্য, মিথ এবং উত্তরাধিকার। অন্যদিকে, এক বিক্ষুব্ধ তরুণ, যার প্রশ্নে কেবলই ফুটে ওঠে বিদ্রূপ। এই দুই অসমবয়সী মানুষের সংলাপ থেকে শেষ পর্যন্ত কোনও সমাধান মেলে না। বরং এই সমাজে বামপন্থী চিন্তাধারা এবং আন্দোলনের দ্বন্দ্ব, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় দর্শকদের। এতে অভিনয় করেছেন ভাস্কর সান্যাল ও দেবার্ঘ্য মন্ডল।

পঞ্চম নাটক ‘বৎসলা’। এই নাটকটিকে আন্তিগোনে নাটকের পুনর্নির্মাণ বলা যায়। তবে তা ওই গল্পের নিছকই পুনর্নির্মাণ নয়, বরং এক বিদ্রোহী মেয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে এর পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই চরিত্রে রত্না চক্রবর্তীর অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে প্রতিরোধ, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত সাহসের এক নতুন ভাষ্য।

শেষ নাটক ‘বিক্রম রাঠোর’। ব্যাঙ্গাত্মক এই নাটকটিতে দেখা যায় এক মধ্যবিত্ত মানুষকে, যে স্বপ্ন দেখে বীর হয়ে ওঠার। কখনও সে নিজেকে বলিউডের নায়ক ভাবে, আবার কখনও সে হয়ে উঠতে চায় ‘দন কিহোতে’ (Don Quixote)। আসলে এ যেন তার নিজের সঙ্গেই এক ধরনের রসিকতা, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে সমাজ ও রাজনীতি। সেই সঙ্গে মানুষের কল্পনার জগৎ নিয়ে থাকে গভীর প্রশ্ন। বাম অথবা দক্ষিণপন্থী– সব প্রশ্নই সমালোচনার মুখে পড়ে। বিক্রম রাঠোরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শশী গুহ।

শশী গুহ এই নাটকের নির্দেশক। তিনি ৬টি অন্তরঙ্গ নাটককেই ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। মঞ্চসজ্জাও এই ব্যতিক্রমী প্রযোজনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মঞ্চে একটি কঙ্কালের উপস্থাপনা আসলে জীবন ও আদর্শের ভঙ্গুরতা এবং মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে। তড়িৎ মিত্রের নাটকে অন্ধকার এবং আদর্শের অবক্ষয় বিষয়ে নানান প্রশ্ন সব সময়ই নতুন নতুনভাবে উত্থাপিত হয়, যা আসলে নিজেদেরই আত্মসমীক্ষার বা গূঢ়তর বিপন্নতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আর তাই এখানে জীবনানন্দ দাশের উক্ত কবিতাটির নানান পঙক্তি ঘুরেফিরে আসে। “বধূ শুয়েছিলো পাশে— শিশুটিও ছিলো;/ প্রেম ছিলো, আশা ছিলো— জ্যোৎস্নায়– তবু সে দেখিল/ কোন্ ভূত?”— এই প্রশ্ন কেবলই তাড়িত করে তড়িৎ মিত্রের নাটকের দর্শকদের। এই নাটকের সফল উপস্থাপনা করেছেন নির্দেশক শশী গুহ। অভিনেতারা প্রত্যেকে নিজের মতো করে চরিত্র নির্মাণে সক্ষম হয়েছেন। তার মধ্যেই রত্না চক্রবর্তী, সুপ্রিয়া রায়চৌধুরী বা শশী গুহ আলাদা করে নজর কাড়েন। ভালো লাগে সোনালী হালদারের গান ও এই গানের ব্যবহার। আলো সৌমেন হালদারের, রূপসজ্জায় অর্পণ মল্লিক।