• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 30 July, 2026

সমাজমাধ্যম জুড়ে মোটিভেশনাল স্পিকাররা যেভাবে মানসিক অস্থিরতা ছড়াচ্ছে

আজকের হাইপার-ডিজিটাল যুগে সমাজমাধ্যমের ক্ষুদ্র স্ক্রিন জুড়ে তথাকথিত ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ বা জীবনশৈলী উপদেষ্টাদের ভার্চুয়াল সাম্রাজ্য

সমাজমাধ্যম জুড়ে মোটিভেশনাল স্পিকাররা যেভাবে মানসিক অস্থিরতা ছড়াচ্ছে

সমাজমাধ্যম জুড়ে মোটিভেশনাল স্পিকাররা যেভাবে মানসিক অস্থিরতা ছড়াচ্ছে PIC- AI

আজকের হাইপার-ডিজিটাল যুগে সমাজমাধ্যমের ক্ষুদ্র স্ক্রিন জুড়ে তথাকথিত ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ বা জীবনশৈলী উপদেষ্টাদের ভার্চুয়াল সাম্রাজ্য এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাহ্যিক চাকচিক্য, চটকদার ভিডিও এডিটিং, কৃত্রিম উচ্চকণ্ঠের বাচনভঙ্গি এবং সুপরিকল্পিত শব্দের মোড়কে এই চ্যানেলগুলো প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষকে সম্মোহিত করছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই বক্তারা সমাজের মানুষকে হতাশা থেকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছেন বা তাদের দিশাহীন জীবনে আশার আলো সঞ্চার করছেন, কিন্তু এর পেছনের রূঢ় বাস্তবটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উদ্বেগজনক।
মানুষের জীবনের জটিল মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে ক্যামেরার সামনে যারা আজ পরম সুখ ও নিশ্চিত সফলতার ফেরিওয়ালা সেজে বসে আছে, অনুসন্ধানী মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টি দিলে দেখা যায় তাদের অনেকেই নিজস্ব ব্যক্তিগত জীবনে চরম অপূর্ণ, একাকী ও তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বের শিকার। অথচ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তারা এমন এক অলীক ও অবাস্তব জীবনের সমীকরণ তৈরি করে, যা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। বর্তমান ভার্চুয়াল জগতের এই রমরমা ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে কেবলই অর্থোপার্জনের তীব্র লোভ, অ্যালগরিদমকে কাজে লাগিয়ে ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা ও কর্পোরেট বাণিজ্যিক স্বার্থ।
মুনাফার অ্যালগরিদম ও অলীক সুখের বিপণন:
সমাজমাধ্যমের বর্তমান ব্যবসায়িক নীতি অনুযায়ী যত বেশি ভিউজ এবং সাবস্ক্রাইবার, তত বেশি বিজ্ঞাপন রাজস্ব ও অর্থনৈতিক মুনাফা। আর এই বিপুল অর্থ উপার্জনের নেশায় এই স্পিকাররা অবাস্তব, কাল্পনিক এবং ছদ্ম-মনস্তাত্ত্বিক জীবনবোধকে এমনভাবে সাজিয়ে পেশ করে, যা সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের কৃত্রিম উদ্দীপনা ও তাৎক্ষণিক আবেশ তৈরি করে। যে কোনও সাধারণ শ্রোতা যখন নিজের জীবনের কোনও কঠিন সময়ে, ক্যারিয়ারের সংকটে বা পারিবারিক টানাপোড়েনে একটু মানসিক শান্তি কিংবা নতুন পথ খোঁজার উদ্দেশ্যে এই ভিডিওগুলো দেখে, তখন তারা এই চটকদার বুলিগুলোকে ধ্রুবসত্য বলে ধরে নেয়। তারা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় যে, এই মোটিভেশনাল তত্ত্ব আসলে কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং এটি চ্যানেলের মালিকের কেবল মুনাফা লোটার ও নিজের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তারের এক অভিনব মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।
মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ:
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা নির্দেশ করে যে, অনিয়ন্ত্রিত এবং অবাস্তব পজিটিভিটি বা ‘টক্সিক পজিটিভিটি’ মানুষের স্বাভাবিক দুঃখ ও লড়াই করার ক্ষমতাকে অবদমিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে আরও বেশি ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়।
আশ্চর্যজনক এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চ্যানেলগুলোর সিংহভাগ দর্শক ও শ্রোতাই হলো বর্তমান তরুণ প্রজন্ম। জীবনের প্রারম্ভেই ক্যারিয়ারের তীব্র চাপ, একাকিত্ব, সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এবং নানাবিধ অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে এই যুবসমাজ অতি সহজেই এই ‘শর্টকাট সফলতা’ বা রাতারাতি ভাগ্য বদলানোর প্রলোভনে পা দেয়। কিন্তু সমস্যাটি প্রকট হয় তখনই, যখন ভিডিওর সেই নিখুঁত স্ক্রিপ্ট ও অবাস্তব সফলতার সঙ্গে তরুণরা নিজেদের বাস্তব জীবনের রুক্ষ ও জটিল পরিস্থিতির কোনও মিল খুঁজে পায় না। এই বৈপরীত্যের ফলেই শুরু হয় গভীর মানসিক বিপর্যয়।
ভার্চুয়াল পর্দা থেকে সাহিত্যের প্রাঙ্গণে ‘সেলফ-হেল্প’ বইয়ের চতুর ব্যবসা:
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই ব্যবসার জাল এখন শুধু ভার্চুয়াল স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মননশীল সাহিত্যের অন্দরেও। নিজের জীবনের চরম অপূর্ণতা ও বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে এই মোটিভেশনাল স্পিকাররা আজকাল আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বইমেলার মতো পবিত্র, ঐতিহ্যবাহী ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাঙ্গণকেও তাদের একচেটিয়া ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করছে। সমাজমাধ্যমে বিপুল ফ্যানবেস ও ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তাকে মূলধন করে এরা একের পর এক ‘সেলফ-হেল্প’ বা জীবন গড়ার চটকদার নির্দেশিকা বই লিখছে।
সাম্প্রতিক প্রকাশনা সমীক্ষা অনুযায়ী, মেলাগুলোতে বিক্রি হওয়া নন-ফিকশন বইয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ স্থান দখল করে নিয়েছে চটকদার সেলফ-হেল্প ও মোটিভেশনাল বই, যার সিংহভাগ ক্রেতাই তরুণ-তরুণী। সমাজমাধ্যমের অ্যালগরিদম এবং  অর্থের বিনিময়ে প্রোমোশন ব্যবহার করে যেভাবে এই বইগুলোর আগ্রাসী বিপণন বা মার্কেটিং করা হয়, তার মোহে পড়ে সাধারণ পাঠক— বিশেষ করে তরুণ সমাজ— কোনও বিচার-বিবেচনা বা গুণগত মান যাচাই ছাড়াই সেগুলো দেদার কিনছে। এই স্পিকাররা বইয়ের পাতায় এমন কিছু কৃত্রিম ও চটকদার মনস্তাত্ত্বিক ফর্মুলা সাজিয়ে দেয়, যা আদতে মানুষের কোনও বাস্তব বা কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে পারে না। ফলে বইমেলার মতো সুস্থ মননশীল প্রাঙ্গণও আজ এই চতুর ব্যবসায়ীদের মুনাফা লোটার এক নতুন উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রগতিশীল ও চিন্তাশীল সুস্থ সাহিত্যের বদলে দেদার বিক্রি হচ্ছে বিভ্রান্তিকর মোটিভেশনের এক চকচকে মোড়ক।
সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও তীব্র মানসিক অস্থিরতা:
বাস্তব জীবনে এই সাজানো কথা কিংবা চটকদার বইয়ের কোনও বাস্তব প্রতিফলন না দেখতে পেয়ে তরুণদের মনে ক্রমেই দানা বাঁধে তীব্র আত্মগ্লানি, গভীর হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অস্থিরতা। ভিডিও এবং বইগুলোতে যেভাবে রাতারাতি অবাস্তব ধনী হওয়া, ২৪ ঘণ্টাই উৎপাদনশীল থাকা বা জাগতিক প্রাচুর্য ও লাইফস্টাইল প্রদর্শনকেই জীবনের সুখ ও সার্থকতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে অনবরত প্রচার করা হয়, তা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সরল ও স্বাভাবিক আনন্দকে বিষিয়ে তুলছে।
এর প্রত্যক্ষ সামাজিক প্রভাবে বর্তমান সমাজে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে পারিবারিক দূরত্ব, সামাজিক বিচ্ছেদ এবং সাংসারিক কলহ। মানুষ তার চারপাশের ছোট ছোট যত্ন, পারস্পরিক ভালোবাসা, মানবিক সহানুভূতি বা বর্তমান মুহূর্তের বাস্তব সুখকে উপভোগ করতে ভুলে গিয়ে এক অলীক, যান্ত্রিক ও কাল্পনিক সফলতার পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে। যখনই সেই অবাস্তব লক্ষ্য পূরণ হয় না, তখনই নিজেদের ব্যর্থ ভেবে তাদের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা, ক্লিনিক্যাল অবসাদ এবং আত্মহত্যার মতো মারাত্মক ও আত্মঘাতী প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সাজানো ও বাণিজ্যিক মোটিভেশন আসলে মানুষের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, নিজস্ব গতিতে বিকশিত হওয়া এবং জীবনের স্বাভাবিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার সহজাত ক্ষমতাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে, যা এক প্রকার সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্যতা:
এই ভয়াবহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়ের মুখে দাঁড়িয়ে প্রশাসন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর উদাসীন থাকার কোনও সুযোগ নেই। বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই মানসিক অস্থিরতা, ডিপ্রেশন ও আত্মবিমুখতা বৃদ্ধির পেছনে যে এই তথাকথিত মোটিভেশনাল স্পিকারদের অনিয়ন্ত্রিত, অবৈজ্ঞানিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বাণিজ্যের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। যত বেশি উগ্র ও চমকপ্রদ পরিবেশনা, ততই বেশি ভিউজ এবং বইয়ের কাটতি— এই অনৈতিক বাণিজ্যিক সমীকরণকে মূলধন করে যেভাবে তরুণ প্রজন্মের মন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছে, তার ওপর এখনই কড়া নজরদারি ও কঠোর আইনি ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা অপরিহার্য।
অবৈজ্ঞানিক, মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই রমরমা ও ক্ষতিকর ব্যবসা বন্ধ করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কনটেন্ট নীতি পুনর্বিবেচনা করা এবং জাতীয় বইমেলার মতো প্রাঙ্গণেও এই ধরণের সস্তা ও বিভ্রান্তিকর প্রকাশনার ওপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সঠিক নির্দেশিকা ও সেন্সরশিপ জারি করা আজ সময়ের দাবি। তরুণ সমাজকে এই অলীক মোহের ফাঁদ ও ছদ্ম-মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একটি বাস্তবমুখী, যুক্তিভিত্তিক, সুস্থ ও প্রগতিশীল জীবনধারায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় এক বিশাল সম্ভাবনাময় প্রজন্ম এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক পঙ্গুত্বের দিকে ধাবিত হবে।