শিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে কথা বলাটাই সমাজে অস্বস্তিকর। কিন্তু সেই অস্বস্তির কারণে চোখ বন্ধ করে থাকলে বিপদ আরও বাড়ে। কারণ, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের যৌন নিপীড়নের ছবিও এখন নতুন এক ভয়ংকর রূপ পেয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ভুয়ো যৌন ছবি আর ভিডিও। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এইসব কনটেন্টের প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বড় সমাজমাধ্যমগুলোর বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেক ট্র্যান্সপারেন্সি প্রজেক্ট বা টিটিপি-র এক অনুসন্ধান এই ভয়াবহ বাস্তবকে সামনে এনেছে। তাদের দাবি, গত কয়েক মাসে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শত শত অর্থপ্রদত্ত বিজ্ঞাপন পাওয়া গিয়েছে, যেগুলোতে শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি বা
এআই-নির্মিত এমন ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া ৩৩২টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ৮৪টি ভারতে প্রচারিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, ভারতের ক্ষেত্রে অধিকাংশ বিজ্ঞাপনই এমন সময়ে প্রচারিত হয়েছে, যখন ভারত সরকার ইতিমধ্যে মেটাকে শিশু যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল।
এখানেই প্রশ্নটা শুধু প্রযুক্তির নয়, দায়িত্বেরও। সমাজমাধ্যমে সাধারণ একজন ব্যবহারকারী একটি ছবি পোস্ট করলে সেটি প্রকাশের আগে নানা ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কাজ করে। বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তো যাচাই আরও কঠোর হওয়ার কথা। কারণ বিজ্ঞাপনদাতা টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট মানুষের কাছে নিজের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। অর্থাৎ প্ল্যাটফর্মের কাছে বিজ্ঞাপনদাতা, বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু এবং কোথায় মানুষকে পাঠানো হচ্ছে— সবকিছুর তথ্য থাকার কথা।
তারপরও যদি শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়, তাহলে সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। মেটা অবশ্য বলেছে, তারা শিশুদের যৌন নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেয় না। তাদের বক্তব্য, অপরাধীরা ক্রমাগত নতুন কৌশল ব্যবহার করে তাদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মেটা আরও জানিয়েছে, তারা এমন বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও বন্ধ করার জন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ব্যবহার করে এবং অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়।
কিন্তু এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— অভিযোগ করার দায়িত্ব কি শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীর? টিটিপি-র দাবি অনুযায়ী, ভারতে পাওয়া ৮৪টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ৫৫টি সম্পর্কে তারা মেটার নিজস্ব রিপোর্টিং ব্যবস্থায় অভিযোগ করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু অভিযোগের পর ৪৩টি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তাদের জানানো হয় যে, বিজ্ঞাপনগুলো নীতিমালা লঙ্ঘন করছে না। অথচ পরে মেটার কাছে বিষয়টি পৌঁছনোর পর বিজ্ঞাপনগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনা সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। কারণ শিশু যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য সাধারণ কোনও নীতিমালা লঙ্ঘনের মতো নয়। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ। একটি ছবি একবার ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। তাই এমন কনটেন্ট প্রকাশের আগেই আটকানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি নতুন বিপদ তৈরি করেছে এআই। আগে শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি বলতে বাস্তব অপরাধের ছবি বোঝানো হতো। এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাস্তব শিশুর ছবি নিয়ে সেটিকে বিকৃত করে যৌন দৃশ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব। এতে অপরাধীরা একদিকে ভুক্তভোগীকে সরাসরি শারীরিকভাবে নির্যাতন না করেও ভয়ংকর ক্ষতি করতে পারে, অন্যদিকে পুরনো শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকেও ফাঁকি দিতে পারে।
এখানে বিষয়টি আরও জটিল। কোনও শিশুর সাধারণ ছবি— যেমন পারিবারিক অনুষ্ঠান, স্কুল, খেলাধুলো বা সামাজিক অনুষ্ঠানের ছবি— কেউ সংগ্রহ করে এআই দিয়ে বিকৃত করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ শিশুর অনলাইন গোপনীয়তা রক্ষা এখন শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি শিশু সুরক্ষার অংশ।
ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট তৈরি, সংরক্ষণ বা ছড়িয়ে দেওয়া গুরুতর অপরাধ। ফলে সমাজমাধ্যমে এমন কনটেন্ট পাওয়া গেলে শুধু সেটি মুছে ফেলাই যথেষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার প্রশ্নটিও স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসে যায়।
শিশু অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং ব্যবস্থায় তথ্য পাঠালেও ভারতীয় আইন অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্রিয় নয়। এই অভিযোগের সত্যতা ও আইনি ব্যাখ্যা অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার— ভারতে পরিচালিত প্ল্যাটফর্মগুলির ভারতীয় আইন ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় থাকা জরুরি।
শুধু মেটাকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এআই অ্যাপ তৈরিকারী সংস্থা, বিজ্ঞাপনদাতা, বিজ্ঞাপন পরিবেশক, সমাজমাধ্যম এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা— প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে। কোনও একটি স্তর ব্যর্থ হলেই অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যায়। বিশেষ করে মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থায় তৃতীয় পক্ষের বিজ্ঞাপন এজেন্সি বা ‘রিসেলার’-দের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একটি প্ল্যাটফর্ম যদি কোটি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন ব্যবসা করে, তাহলে তার হয়ে বিজ্ঞাপন আনা অংশীদারদের ওপরও কঠোর নজরদারি থাকা উচিত। ‘আমরা জানতাম না’— শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এটি গ্রহণযোগ্য অজুহাত হতে পারে না।
একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। শুধু নির্দেশ জারি করলেই হবে না। সেই নির্দেশ বাস্তবে মানা হচ্ছে কি না, তা জানার জন্য তার নিয়মিত স্বাধীন অডিট প্রয়োজন। সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলির কাছে স্বচ্ছ রিপোর্ট চাওয়া দরকার— কতগুলি বিজ্ঞাপন আটকানো হয়েছে, কতগুলি অভিযোগ এসেছে, কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কতগুলি ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানানো হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুদের নিরাপত্তাকে ব্যবসায়িক লাভের নিচে রাখা যাবে না। সমাজমাধ্যমে বিজ্ঞাপন থেকে বিপুল অর্থ আয় হয়। কিন্তু সেই আয়ের ব্যবস্থায় যদি অপরাধীরা শিশুদের ব্যবহার করার সুযোগ পায়, তাহলে প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তিগত সাফল্য নিয়ে যতই গর্ব করা হোক না কেন, তার সামাজিক দায়িত্ব পালনের জায়গায় বড় ঘাটতি থেকেই যায়।
এআই নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য অসংখ্য সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যখন শিশুদের অপমান, শোষণ ও নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হওয়া দরকার। প্রযুক্তি অপরাধীদের হাতে দ্রুত পৌঁছলে শিশু সুরক্ষার আইন ও প্রযুক্তিও তার চেয়ে দ্রুত এগোতে হবে।
এই লড়াইয়ে সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ শিশুরা। তারা নিজের হয়ে অভিযোগ করতে পারে না, নিজের ছবি কোথায় কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে তা বুঝতেও পারে না। তাই তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব বড় প্রযুক্তি সংস্থা, সরকার এবং সমাজ— সবার। শিশু যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ শুধু নীতিমালায় লেখা একটি বাক্য হলে চলবে না। সেটিকে বিজ্ঞাপন অনুমোদন, কনটেন্ট শনাক্তকরণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আইনপ্রয়োগ— প্রতিটি স্তরে বাস্তব নিয়মে পরিণত করতে হবে। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনও ‘অ্যালগরিদমিক ভুল’ হতে পারে না।




