মাত্র ২৯ দিন আগে নবান্নে প্রকল্প চালু করে প্রথম দফায় টাকা পেয়েছিলেন আটাশ লক্ষের কিছু বেশি মহিলা। মঙ্গলবার বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুরের জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে পরিসংখ্যান দিলেন, তাতে সেই সংখ্যাটাই এক লাফে পৌঁছে গিয়েছে সওয়া কোটিতে। তাঁর ঘোষণা, বুধবার অর্থাৎ পয়লা জুলাই থেকে রাজ্যের এক কোটি বিশ লক্ষেরও বেশি মহিলার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ঢুকবে তিন হাজার টাকা করে।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, অন্নপূর্ণা যোজনায় আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় এক কোটি একান্ন লক্ষ। ঝাড়াইবাছাই শেষে তার মধ্যে এক কোটি কুড়ি লক্ষেরও বেশি আবেদনকারীকে যোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আবেদনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন।
গত পয়লা জুন থেকে কার্যকর হওয়া এই প্রকল্প আদতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডারের জায়গা নিয়েছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা পেতেন দেড় হাজার টাকা, তপসিলি জাতি-জনজাতির মহিলারা পেতেন ১৭০০ টাকা। অন্নপূর্ণায় জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য বরাদ্দ এক, তিন হাজার টাকা। ভোটের আগে বিজেপির প্রচারে যে মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড বিলি করা হয়েছিল, তারই বাস্তব রূপ এই অন্নপূর্ণা যোজনা।
কিন্তু সংখ্যার এই লাফের পিছনে লুকিয়ে আছে একটা রাজনৈতিক লড়াইও। প্রকল্প চালুর দু’দিনের মাথায়, গত ২৯ মে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি আক্রমণ করেছিলেন আবেদনপত্রের দৈর্ঘ নিয়ে। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভোটের আগে দেখানো ফর্মটা ছিল মাত্র আধ পাতার, অথচ আসল ফর্ম গিয়ে দাঁড়িয়েছে এগারো পাতায়। লক্ষ্মীর ভান্ডারের দুই পাতার ফর্মে যেখানে দুই কোটি চল্লিশ লক্ষ মহিলা সুবিধা পেয়েছিলেন, সেখানে এত বড় ফর্মে পঞ্চাশ লক্ষও পৌঁছবে না বলে কটাক্ষ করেন তিনি। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ আবার নির্দিষ্ট ভাবে প্রশ্ন তোলেন সন্তানের টিকাকরণের তথ্য চাওয়া নিয়ে, তাঁর যুক্তি ছিল, একজন মহিলার প্রাপ্য আর্থিক সাহায্যের সঙ্গে শিশুর টিকাকরণ জুড়ে দেওয়াটা শর্তসাপেক্ষ এবং সাংবিধানিক ভাবে আপত্তিকর।
সরকার পক্ষের ব্যাখ্যা অবশ্য উল্টো। শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার দাবি করেছেন, লক্ষ্মীর ভান্ডারে বহু ভুয়ো সুবিধাভোগী ছিলেন, এমনকি পুরুষরাও মহিলাদের জন্য বরাদ্দ এই প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর। সরকারি সূত্রের দাবি, পুরনো তালিকার প্রায় ত্রিশ লক্ষ নাম যাচাই প্র্ক্রিয়ায় অযোগ্য বলে বাদ পড়েছে, যার একটা বড় অংশ মৃত, স্থানান্তরিত বা ভোটার তালিকা সংশোধনে (SIR) বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের নাম। ১১ পাতার ফর্ম নিয়ে সমালোচনার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী আগেই জানিয়েছিলেন, ব্লক স্তরের আধিকারিকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পূরণে সাহায্য করবেন, যাতে যোগ্য কেউ বাদ না পড়েন।
প্রকল্পের যোগ্যতার মূল শর্ত, আবেদনকারীর বয়স হতে হবে পঁচিশ থেকে ষাটের মধ্যে। সরকারি বা সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চাকরি বা পেনশনভোগী হলে কিংবা আয়কর দিলে এই প্রকল্পে আবেদনের সুযোগ নেই। আবেদন প্রক্রিয়া চলবে আগামী পঁচিশে অগস্ট পর্যন্ত, ফলে যোগ্য উপভোক্তার সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকছে।
মুকুটমণিপুরের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা স্পষ্ট, যাচাই প্রক্রিয়া যত ধীরই মনে হোক, তার ফল এখন চোখে দেখা যাচ্ছে। বিরোধীদের ফর্ম-বিতর্কের জবাব তিনি দিতে চেয়েছেন সরাসরি সংখ্যা দিয়েই।




