ইতিহাসের দরজায় বারবার কড়া নেড়েছেন ভারতীয় মহিলা কুস্তিগীররা। কখনও অল্পের জন্য স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, কখনও ফাইনালে উঠে রুপো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। কিন্তু এ বার আর খালি হাতে ফিরতে হল না। বিশ্বকুস্তির মঞ্চে প্রথম বার সোনার পদক জিতলেন কোনও ভারতীয় মহিলা।
শুক্রবার কাজাখস্তানের আস্তানায় সিনিয়র বিশ্বকুস্তি প্রতিযোগিতার ৫৯ কেজি বিভাগের ফাইনালে আমেরিকার অ্যাবিগেল নেটকে ৮-৬ পয়েন্টে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন হরিয়ানার মণীষা ভানওয়ালা (Manisha Bhanwala)।
তবে এই জয় মোটেই সহজ ছিল না। বরং এক সময় মনে হয়েছিল, ফাইনাল থেকে রুপো নিয়েই ফিরতে হবে ভারতীয় কুস্তিগিরকে। লড়াইয়ের শুরুতে ০-৬ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়েছিলেন মণীষা (Manisha Bhanwala)। কিন্তু সেখান থেকেই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। দ্বিতীয় পর্বে একের পর এক আক্রমণে প্রতিপক্ষকে কার্যত দিশাহারা করে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৮-৬ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে ভারতীয় মহিলা কুস্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখলেন ২৯ বছরের এই কুস্তিগির।
জয়ের পরে নিজের আবেগ সামলাতে পারেননি মণীষা (Manisha Bhanwala)। বললেন, ‘এই মুহূর্তে কী অনুভব করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। অনেক দিন ধরে এই মুহূর্তটার অপেক্ষায় ছিলাম। ২০২২ সাল থেকেই লিখে আসছি, এক দিন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হব। আমার স্বপ্ন ছিল, প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া। আজ সেই স্বপ্ন সত্যি হল। এই স্বপ্ন নিয়েই আমি এগিয়ে যেতে চাই।’
Good morning India 🇮🇳 First-ever World Champion Manisha’s golden moment 🥇 https://t.co/G7KMSXqiyW
— United World Wrestling (@wrestling) October 31, 2026
ফাইনালে তাঁর প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে ছিল বিশেষ একটি কৌশল। মণীষার (Manisha Bhanwala) প্রিয় অস্ত্র ‘গাট রেঞ্চ’। প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলে কোমরের দিক থেকে ঘুরিয়ে পয়েন্ট আদায় করার এই কৌশলেই ম্যাচে সমতা ফেরান তিনি। মণীষার কথায়, ‘এই কৌশলটা বেশ কিছু দিন ধরেই আমার সবচেয়ে পছন্দের। যখন সেটা প্রয়োগ করতে পেরেছিলাম, মনে হয়েছিল খুব সহজেই ১০ পয়েন্টে পৌঁছে যাব, এমনকি প্রতিপক্ষকে পিনও করতে পারব। কিন্তু ও সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। তখন অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তার পর আবার আক্রমণ করি।’
আরও পড়ুন: আজও হয়তো ম্যাকা, মিগুয়েল, আপুইয়াকে ছাড়াই লড়াই মোহনবাগানের, খেলায় উন্নতি চান কোচ
এই সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর প্রয়াত বাবার স্মৃতিও। কুস্তিতে আসার পিছনে বাবারই সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল। ২০২২-এ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে যোগ দিতে যাওয়ার দিনই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা সুরেশ। সেই শোক বুকে নিয়েই লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন মণীষা। ফাইনালের দিনও বাবার ছবি সঙ্গে রেখেছিলেন তিনি।
মণীষা (Manisha Bhanwala) বলেছেন, ‘আমি সব সময়ই বাবার সবচেয়ে প্রিয় ছিলাম। আমাদের দুই বোন ও এক ভাই। কিন্তু মনে হয় বাবা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন। প্রথম বার হস্টেলে যাওয়ার সময়ও মনে হত, বাবা যেন আমাকে ডাকছেন। এখনও তাঁর উপস্থিতি অনুভব করি। মনে হয় বাবা আমার ভিতরেই রয়েছেন, আমার সঙ্গে কথা বলছেন। এই অনুভূতি ব্যাখ্যা করা কঠিন।’
এই বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের মহিলা কুস্তিগিরদের অভিযানও বেশ সফল। মণীষার সোনার পাশাপাশি রুপো জিতেছেন নীলম সিরোহি (৫০ কেজি) এবং কাজল ধোচক (৭৬ কেজি)। ব্রোঞ্জ পেয়েছেন তনু শর্মা (৭২ কেজি)। অর্থাৎ, ভারতীয় মহিলা দল মোট চারটি পদক নিয়ে প্রতিযোগিতা শেষ করল।
আরও পড়ুন: সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের দল ঘোষণা ভারতের, কোচ মুসার ভরসা তরুণ-অভিজ্ঞদের মিশ্রণ
পুরুষদের বিভাগে ভারতের হয়ে ২০১০ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন সুশীল কুমার। তাঁর ১৬ বছর পরে দ্বিতীয় ভারতীয় হিসাবে সেই কৃতিত্ব অর্জন করলেন মণীষা (Manisha Bhanwala)। তবে মহিলা কুস্তিতে তিনিই প্রথম। আগামী বছরের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ৫৭ কেজি বিভাগে নেমে আবার সোনা উজিততে চান তিনি। মণীষার আশা, তাঁর এই সাফল্য ভারতীয় মহিলা কুস্তিগিরদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। ফাইনালে ওঠার পরে আর কেউ চাপের মুখে ভয় পাবেন না।
তাঁর (Manisha Bhanwala) কথায়, ‘আগামী বছর আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ৫৭ কেজি বিভাগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য সেরাটা দেব। আশা করি, এ বার থেকে ভারতীয় মেয়েরা ফাইনালে উঠলে বা চাপের মুখে পড়লে আর ভয় পাবে না। এখন তাদের মনে নতুন আশা তৈরি হয়েছে।’
দেখুন:




