একমাসেরও বেশি জেলে কাটানোর পর মাঠে ফিরে রঞ্জি ট্রফিতে সেঞ্চুরি, ক্রিকেট জীবনের দ্বিতীয় প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি। কারাগারের অন্ধকার থেকে ক্রিকেটের আলোয় ফেরার এই অভিযানে অভিষেক পোড়েল ধন্যবাদ দিলেন, বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্ল ও সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গাপাধ্যায়কে।
সোমবার কল্যাণীতে দিল্লির বিরুদ্ধে রঞ্জি ট্রফির দ্বিতীয় দিনের খেলায় ১৩টি চার ও একটি ছয় হাঁকিয়ে ১৬১ বলে ১১৪ রান করেন অভিষেক পোড়েল। যিনি ধর্ষণ ও সহবাসের অভিযোগে ৩৬ ধরে পুলিশি ও জেল হেফাজতে থাকার পর ১৭ সেপ্টেম্বর জামিন পেয়েছেন।
জামিন পাওয়ার পরই বাংলা শিবিরে যোগ দেন অভিষেক এবং মাত্র দিন দশেকের অনুশীলনে নিজেকে কতটা তৈরি করে তোলেন, তার প্রমাণ তিনি দেন এই দিনই। বাংলার আরেক সেঞ্চুরিয়ান সুদীপ কুমার ঘরামিও তাঁকে এই ঘুরে দাঁড়ানোয় পুরোপুরি সাহায্য করেন।সুদীপ দিনের শেষে ১২২ রানে অপরাজিত। এর মধ্যে ১৭টি বাউন্ডারি রয়েছে। এই দুই সেঞ্চুরির ফলেই দিল্লির ২৪০-এর জবাবে দিনের শেষে বাংলা ৩০৪-৩-এ দাড়িয়ে।
সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পরই এ দিন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিষেক। চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। অসাধারণ প্রত্যাবার্তনের পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দুবছর ধরে আমার পারফরম্যান্স ভাল হয়নি। চোট ছিল, ব্যক্তিগত জীবনেও টালমাটাল অবস্থা ছিল, লক্ষ্মীদা, সৌরভ স্যারকে ধন্যবাদ, যে ভাবে বিশেষ ও বাড়তি অনুশীলন করিয়ে আমাকে দশ দিনে তৈরি করেছেন, সেজন্য। সেঞ্চুরি পাচ্ছিলাম না দুবছর ধরে। অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। সব কিছু থেকে বেরিয়ে এসে নতুন জীবন পেলাম’।
৩৬ দিন তাঁকে জেলে কাটাতে হয়। ক্রিকেটে ফিরতে পারবেন কি না, জানতেন না। এই দুঃসময় থেকে জীবনের কঠোর বাস্তবটা শিখলেন, জানালেন অভিষেক। বলেন, ‘সম্পুর্ণ অন্য একটা জগতে কী ভাবে কাটাতে হয় শিখেছি। যেটা মানসিক ভাবে আমাকে আরো শক্তিশালী করেছে। ওই সময়ে একেকটা মুহূর্ত যে ভাবে কাটিয়েছি, সেগুলোই আজ ব্যাট করার সময় মনে পড়ছিল। ভেবেই রেখেছিলাম মুখে নয়, ব্যাটেই সব কিছুর জবাব দেব। ক্রিকেটই যে আমার সবকিছু সেটাই দেখালাম’।
৯৯ থেকে একশোয় পৌঁছতে অভিষেকের লেগে যায় ১৪ বল। এর মধ্যে এতটাই নার্ভাস হয়ে পড়েন অভিষেক যে, একবার রান আউট হতে হতেও বেঁচে যান। তাঁকে একেবারে সঠিক কল দিয়ে তখন বাঁচিয়ে দেন সুদীপ। এমন একজন সতীর্থের সঙ্গে পাওয়াটা অভিষেকের এই প্রত্যাবর্তনের একটা বড় কারণ, স্বীকার করে নেন অভিষেক। বলেন, ‘আসলে গত দুবছরে একশো পাইনি, একটু ছটফট করছিলাম, সুদীপ আমাকে ওই সময় খুব সাহায্য করেছে। চোখে জল আপনা আপনিই চলে আসে। ওই সময় বেগ ধরে রাখতে পারিনি’।
মানসিক ভাবে তাঁকে শক্তিশালী রাখতে যে বাংলার কোচ লক্ষ্ণীরতনই সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন, তা জানিয়ে অভিষেক বলেন, ‘আমাদের দলে সবচেয়ে বড় ম্যাচউইনার লক্ষ্মীদা। তার মানসিক শক্তি অসাধরণ, যেভাবে মানসিক ভাবে শক্তিশালী করে তুলেছেন আমাকে, তাও অসাধারণ। বিরাট কোহলি, সৌরভ স্যারের মানসিক শক্তিও কেমন তা দেখেছি আমি। ওদের কাছ থেকেও শিখেছি। সৌরভ স্যারও কথা বলেছেন আমার সঙ্গে, আমাকে দারুণ ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন’।
তিনি যখন হেফাজতে, তখন তাঁর আইপিএল দলের সতীর্থ ও জাতীয় দলের তারকারাও নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নেন বলে জানান অভিষেক। বলেন, ‘ইশান কিষাণ, অভিষেক শর্মা, আশুতোষ শর্মারা নিয়মিত ফোন করত আমার বাড়িতে। ওরা বলেছিল যদি সাহায্য প্রয়োজন হয়, ওরা পাশে থাকবে। অবশ্যই এই ৩৬ দিনে অনেক কঠিন জীবন দেখেছি। এ বার ক্রিকেট খেলতে চাই’।
সেই কঠিন সময়ে নিজেকে কী বলতেন, জানতে চাইলে চন্দননগরের তরুণ উইকেটকিপার-ব্যাটার জানান, ‘নিজেকে বলতাম, রাতের পর যেমন সূর্য ওঠে, তেমন আমার জীবনেও হবে। আমার যা কাজ সেটা আমাকে করতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে এবং নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবে। এসবই করেছি। নিজের সেরাটা দিয়ে বাংলাকে জেতানোই এখন লক্ষ্য। গতবার রঞ্জি সেমিফাইনালে বাজে হেরেছি, এ বার ট্রফি দেওয়াই চ্যালেঞ্জ’।
বাংলা আপাতত ৬৪ রানে এগিয়ে। কাল সারাদিন ব্যাট করে যে বড় লিড তৈরি করাই লক্ষ্য, তা জানিয়ে দিলেন অভিষেক। বলেন, ‘কাল যত বেশি রান করা সম্ভব, করব। যত বড় লিড তৈরি করতে পারব, ততই জেতার সম্ভাবনা বাড়বে’।
অন্যদিকে তাঁর সঙ্গী সেঞ্চুরিয়ান সুদীপ ঘরামি বলেন, ‘আমরা একটা বড় পার্টনারশিপ খেলতে চাইছিলাম। অভিষেককে বলি, তোর স্বাভাবিক খেলাটাই খেল। ১০০-র মুখে এসে ছটফট করছিল। আমি বলি স্বাভাবিক খেলাটা খেল, এমনিই রান এসে যাবে, তাড়াহুড়ো করিস না। বন্ধু হিসেবে ওর সাফল্যে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম’। অভিষেক একশোয় পৌঁছনোর পর সুদীপকেও সেলিব্রেট করতে দেখা যায়।




