• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 29 September, 2026

বাবুমশাই জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি

কোঁচকানো সিল্কের সোনারঙা পর্দা। প্রেক্ষাগৃহ প্রায় পূর্ণ। ওই কতো উঁচু সিলিংয়ের হলদেটে আলোগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। আমেজ এনে দেওয়া

বাবুমশাই জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি  নেহি

কোঁচকানো সিল্কের সোনারঙা পর্দা। প্রেক্ষাগৃহ প্রায় পূর্ণ। ওই কতো উঁচু সিলিংয়ের হলদেটে আলোগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। আমেজ এনে দেওয়া সুর কোথা থেকে যেন ভেসে আসে। থার্ড বেল পড়ল। ডিমার আলোগুলো অন্ধকারের রেখা টানল। সামনে অতবড়ো পর্দা ধীরে ধীরে গুটিয়ে গেল। প্রজেক্টের যন্ত্রে এখনই সিনেমার রিলের চাকা ঘুরতে শুরু করবে। মায়াবী আলোকরশ্মিমালা প্রতিভাত হবে দর্শকদের গোগ্রাসে সিনেমা গেলা মুখগুলোর ওপর। হ্যাঁ, আরেকটু পরেই গল্পটির মুহূর্ত, চরিত্র, নাট্য-উপাদানের মধ্য দিয়ে কখন যেন অজান্তেই দর্শকরা পর্দায় প্রক্ষেপিত গল্পগাথার জীবনকথার সঙ্গে একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলবে। আর যদি নাম শীর্ষকের শেষ কার্ডটিতে ভেসে উঠে হৃষিকেশ মুখার্জীর নাম, তাহলে তো নড়েচড়ে বসবেন দর্শককুল। অচিরেই তাঁদের মানসভুবন দখল করতে চলেছে হৃষিকেশের সিনেমা। একটি আলাদা মাত্রা, একটা অনন্য সম্ভ্রম, এক সুচারু তৃপ্তি। তাঁর ছবি মানেই দর্শক সাধারণকে এনে দেয় জীবন খোঁজার জিয়নকাঠি।
হৃষিকেশ মুখার্জীর জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯২২, কলকাতায়। মৃত্যু ২৭ আগস্ট ২০০৬, মুম্বাইয়ে। তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে (১৯৫৩-১৯৯৮) বলিউডে তাঁর কর্মজীবনে ৪৩টি হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং ‘মিডল সিনেমা’র পথিকৃৎ হিসাবে গণ্য করা হয়। এই ধারায় সাধারণ মধ্যবিত্ত ও ভারতীয়দের জীবন ও সংগ্রাম চিত্রিত হয়েছে।
১৯৫১ সালের আশ্বিনের পড়ন্ত বিকেল। বোম্বে মেলের খোলা জানলা দিয়ে চলমান প্রান্তর ক্রমশ পেরিয়ে যাচ্ছেন হৃষিকেশ মুখার্জী। পেছনে ফেলে এলেন আটাশ বছরের চেনা কলকাতা। আরব সাগরের তরঙ্গের পাশে বোম্বে শহরে সিনেমার নতুন সংসার পাততে চলেছেন তিনি। দু’চোখ স্বপ্নময়, নিউ থিয়েটার্সের দিনগুলি ফিরতি মনে উঁকি মারে। কেমিস্ট্রির স্নাতক হৃষিকেশ স্টুডিওর দরজা পেরিয়েছিলেন সিনেমার ল্যাবরেটরি সহকারী হিসাবে। ওই ঐতিহ্যশালী নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে পরিচালক বিমল রায়ের খুব নামডাক। তাঁর পরিচালিত ‘উদয়ের পথে’ তখন দেশে-বিদেশে সম্মানিত। মনোজ ভট্টাচার্যের পরিচালনায় ১৯৫০ সালে শুরু হলো ‘তথাপি’ ছবির কাজ। বি এন সরকারের অনুমতি নিয়ে বিমলবাবু হষিকেশকেই দায়িত্ব দিলেন ছবির সহযোগী পরিচালক
আর সম্পাদনার।
১৯৫০ সালের শেষের দিকে বিমল রায় চললেন বোম্বে। গন্তব্য বোম্বে টকিজ। হিমাংশু রায় মারা গেছেন। দেবিকারানী নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর সাধের বোম্বে টকিজ থেকে। নতুন মালিকানায় নতুন কাজের ধারায় ব্যাস্ত শশধর মুখার্জী, অশোক কুমাররা। কলকাতায় বিমলবাবু মনের মতো ইউনিটটি ছেড়ে গিয়েছিলেন, হৃষিকেশ মুখার্জী তো বটেই, সঙ্গে ছিলেন সহকারী পরিচালক অসিত সেন, লেখক নবেন্দু ঘোষ, অভিনেতা নাজির হোসেন আর কয়েকদিন পরেই এসে ইউনিটে যোগ দিলেন সলিল চৌধুরী ও পরে সাময়িকভাবে ঋত্বিক ঘটকও।
চার্চগেটের কাছে সিনেমা হলে আকিরা কুরোসাওয়ার জাপানি ক্ল্যাসিক ‘রশোমন’ নাইট শোতে হৃষিকেশদের সঙ্গে নিয়ে দেখতে গেলেন বিমল রায়। প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে ‘বেস্ট’ বাসে অত রাতে চার্চগেট থেকে মালাডের বাসায় পৌঁছতে লাগে ঘন্টাখানেক। ওই বাসের মধ্যেই ঠিক হল, ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিটি নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তাবনা। সলিল চৌধুরীর গল্প নিয়ে হষিকেশ মুখার্জীর চিত্রনাট্যে আইকনিক ছবিটি তৈরি হলো। তারপর ইতিহাস। বিমল রায় যখন ‘দেবদাস’ ছবি তৈরি করছেন, তখন তারকা অভিনেতা দিলীপকুমারের সঙ্গেও খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয় হৃষিকেশের। বিনা পারিশ্রমিকে দিলীপকুমার অভিনয় করলেন হৃষিকেশের প্রথম ছবি ‘মুসাফির’-এ। তিনটি আলাদা গল্প, কিন্তু কোথায় যেন এক যোগসূত্র আছে, যেখানে মানবজীবনের তিনটি বৈশিষ্ট্যকে ধরা হয়েছে। জন্ম, মৃত্যু আর বিবাহ। ঋত্বিক ঘটক চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। ১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি চললো না, কিন্তু রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়ে গেল। এটা খুব বড় স্বীকৃতি। ছবিটি দেখে রাজকাপুর মুগ্ধ। তিনি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন পরবর্তী ছবি ‘আনাড়ি’র কাজ করতে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৯৮, এই একচল্লিশ বছরে তাঁর ছবির সংখ্যাও একচল্লিশ।
১৯৬০-এর দশক জুড়ে হৃষিকেশ মুখার্জী সংবেদনশীল সামাজিক সিনেমা নির্মাণ করেন, যেমন ‘অনুরাধা’ (১৯৬১), যেখানে একজন আদর্শবাদী স্বামী উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্ত্রীর বিছিন্নতাকে তুলে ধরা হয়েছে। ‘অনুপমা’ (১৯৬৬), যা এক বিদ্বেষী পিতার দ্বারা পরিত্যক্ত মেয়ের গল্প। তবে ১৯৮০-এর দশকেই হৃষিকেশ মুখার্জীর সৃষ্টিকর্ম তার শিখরে পৌঁছয়। সেই দশকের শুরুতে তিনি এমন একটি কাজ করেন, যাকে অধিকাংশ বোদ্ধাই তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলে মনে করেন। ‘আনন্দ’ (১৯৭১), যেখানে বলিউডের হার্টথ্রব রাজেশ খান্না এবং উদীয়মান তারকা অমিতাভ বচ্চনের চিত্তাকর্ষক অভিনয় রয়েছে। ‘আনন্দ’ হৃষিকেশ মুখার্জীর পরিণত সৃষ্টিশৈলীর চূড়ান্ত নিদর্শন। এতে কারিগরি কারুকার্য এবং ক্যামেরার কৌশল অনুপস্থিত থাকলেও তাঁর পরিচালনায় বিশুদ্ধ আখ্যানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
হৃষিকেশের পরবর্তী কালের চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে ‘গুড্ডি’ (১৯৭১), ‘বাওয়ার্চি’ (১৯৭২), ‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫), ‘গোলমাল’ (১৯৭৯), ‘খুবসুরত’ (১৯৮০)। ‘অভিমান’ (১৯৭৩) ছবিটি এক বিবাহিত দম্পতির গল্প। তারা পেশাদার গায়ক এবং তাদের দাম্পত্যে টানাপোড়েন শুরু হয় যখন স্ত্রীর কর্মজীবন স্বামীর কর্মজীবনকে ছাপিয়ে যায়। হৃষিকেশের চলচ্চিত্রগুলি ভারতীয় মধ্যবিত্ত এবং মূল্যবোধের গল্প বলার ক্ষেত্রে সাবলীলতা এবং হাস্যরসের জন্য বিখ্যাত।
হৃষিকেশ মুখার্জীর ছবি আসলে গল্পভিত্তিক কোনও তথ্যপ্রকাশ নয়। তা ছিল একটা দর্শন, একটা সমাজিক কনসেপ্ট। মানবজীবনের অনেক অন্তর্নিহিত ব্যাপার— যেখানে আশা থাকে, আনন্দ থাকে, মূল্যবোধ থাকে, আর থাকে মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বিষয়ভাবনার বৈচিত্র্যে, গল্পটিকে সিনেমার মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ আর সূক্ষ্ম হিউমার তাঁকে এক নিজস্বতা এনে দিয়েছিল, এক স্বতন্ত্র ঘরানা তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। ছবিগুলো জীবনমুখী সুরমুর্চ্ছনায় ভরা এক আবেগময় তৃপ্তি বোধ এনে দেয়। চরিত্রগুলো যেন পাশের বাড়ির, গল্পের পটভূমি বাস্তবভিত্তিক, কনসেপ্টে জীবনের জয়গান। অতিনাটকীয়তা বর্জন করে তিনি নিজের মনের রংছবিতে তুলি টেনেছেন। ৩০ সেপ্টেম্বর শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া মানুষটি বেঁচে থাকলে হয়তো আজও বলতেন, ‘বাবুমশাই জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে,
লম্বি নেহি।’