বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নভেম্বর মাসে ভারত সফরের সম্ভাব্য আয়োজন নিয়ে ঢাকার তরফে ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রাক্তন বিদেশসচিব আসাদ আলম সিয়াম আগামী মাসের গোড়াতেই দিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন।
তবে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এর আগে আগস্টে শেষ মুহূর্তে তাঁর ভারত সফর বাতিল হয়ে গিয়েছিল। এবারও সফর ঘিরে সংশয়ের পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। একদিকে তাঁর দলের নেতাদের লাগাতার ভারতবিরোধী বক্তব্য, অন্য দিকে ভারত-বাংলাদেশ আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি অদূর ভবিষ্যতে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্পক্ষেত্রে সঙ্কট এবং দেশের বড় অংশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভারতে বাংলাদেশের প্রাক্তন হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ইউএনআই-কে বলেছেন, ‘গঙ্গার জলচুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর দু’মাস বাকি। সময় ফুরিয়ে আসছে। ডিসেম্বরেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।’ তাঁর মতে, বাণিজ্য নিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ভারত ও বাংলাদেশ— দুই দেশই বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধ
জারি করেছিল।
দিল্লির সরকারি মহলের ধারণা, তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে নতুন হাইকমিশনারকে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— গঙ্গার জলচুক্তি এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত সমস্যাগুলি— নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
তবে তারেক রহমানের সফর নিয়ে ঢাকার রাজনৈতিক মহলে আর একটি আশঙ্কাও রয়েছে। ইসলামপন্থী শক্তিগুলি ‘Putsch’ বা আকস্মিক ক্ষমতাদখলের চেষ্টা করতে পারে বলে সেখানে জল্পনা চলছে। সেই চেষ্টায় ছাত্রদের দল এনসিপি-কে যেমন সঙ্গে নেওয়া হতে পারে, তেমনই বিএনপির এত দিনের ‘অনুগত বিরোধী’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকেও পাশে পাওয়ার চেষ্টা হতে পারে। এর লক্ষ্য হতে পারে রহমান সরকারকে সরিয়ে একটি ‘আরও উগ্র বিপ্লবী’ সরকার
প্রতিষ্ঠা করা।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং মরিশাসের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জির কথায়, ঢাকায় কট্টর ইসলামপন্থী শক্তির ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা সব সময়ই ছিল। বর্তমান সরকার ক্রমশ অবনতি হতে থাকা আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে সেই পরিস্থিতিই এমন একটি উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
এদিকে আসাদ আলম সিয়ামের দিল্লি আসার বিষয়টিও এত দিন নিশ্চিত ছিল না। ঢাকার পক্ষ থেকে বেশ কিছুদিন আগেই তাঁর নাম হাইকমিশনার হিসেবে ঘোষণা করা হলেও ভারতের বিদেশ মন্ত্রক তাঁকে দিল্লিতে আসার অনুমতি দেয়নি। এর পিছনে সম্ভবত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছরের গোড়ায় ভারত মন্ত্রী পদমর্যাদার হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ করেছিল। সেই নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আচরণের প্রতিক্রিয়াতেই সিয়ামের নিয়োগ আটকে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিদেশ মন্ত্রকের আধিকারিকদের মতে, সিয়ামের রাজনৈতিক ঝোঁক বিএনপির দিকে। তাঁকেও মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া হতে পারে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। অতীতে তারিক করিম এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলির মতো কয়েকজন হাইকমিশনারকেও এই পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে বাংলাদেশের বর্তমান হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর বিদায়ও দিল্লিতে বিশেষ ভাবে নজরে পড়বে। কারণ, তাঁর বিদায় নিছক কূটনৈতিক প্রোটোকলের বিষয় নয়। দিল্লিতে তাঁর কার্যকালে সাংবাদিক, কৌশলগত বিষয়ের বিশ্লেষক, বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্ক, কূটনীতিক, আমলা, সাংস্কৃতিক মহল এবং রাজনীতিকদের মধ্যে তিনি একটি বিস্তৃত যোগাযোগের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। অথচ তাঁর কার্যকালেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আধুনিক সময়ের অন্যতম কঠিন পর্বের মধ্য দিয়ে গিয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতিপথ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ছিল। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু এবং আওয়ামী লীগের প্রতি আচরণ, ভারতবিরোধী বক্তব্য এবং সেই বক্তব্যের জেরে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলির উপর আক্রমণের ঘটনাও দিল্লির উদ্বেগ বাড়ায়। অন্যদিকে, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান অব্যাহত থাকা নিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারেরও আশঙ্কা ছিল। দুই দেশের এই পারস্পরিক উদ্বেগ ও টানাপোড়েনে সম্পর্ক কার্যত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছয়, যাকে ‘ডিপ ফ্রিজ’ বলাই সবচেয়ে উপযুক্ত।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসে। তখন আশা করা হয়েছিল, দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং ঢাকা ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি নতুন করে পর্যালোচনা করতে থাকে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যেও ভারতবিরোধী সুর অব্যাহত থাকে।
এই পরিস্থিতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, দিল্লিতে রিয়াজ হামিদুল্লাহ এমন একজন কূটনীতিক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন, যিনি ভারতকে অস্বাভাবিক রকম ভালো বুঝতেন এবং একই সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারতেন। সাংবাদিক, কৌশলগত বিশ্লেষক, থিঙ্কট্যাঙ্ক, কূটনীতিক, আমলা, সাংস্কৃতিক মহল এবং রাজনীতিক— বিভিন্ন পরিসরে তাঁর যোগাযোগ ছিল। অথচ তাঁর কার্যকালেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এমন এক কঠিন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংকটপূর্ণ সময়।




