‘বন্দেমাতরম’ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি দিলেন নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি নিজেকে ‘বন্দেমাতরম’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের উত্তরসূরি হিসাবে উল্লেখ করে সোনিয়া গান্ধীকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে তাঁর অভিযোগ, স্বাধীনতা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে জাতীয়তাবাদী এই গান পরিবেশনের সময় যে আচরণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং আপত্তিকর।
১৫ আগস্ট স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তির আবহে দেশ ‘বন্দেমাতরম’-এর মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করছে। ঠিক তখনই দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তরের ঘটনায় তিনি ‘গভীর ভাবে আহত’ হয়েছেন বলে চিঠিতে জানিয়েছেন সুমিত্র। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের আচরণ নয়, বরং ইতিহাসের একটি ‘কলঙ্কজনক পুনরাবৃত্তি’।
চিঠিতে ১৮৯৬ সালের কলকাতা অধিবেশনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন নৈহাটির বিধায়ক। তাঁর দাবি, ওই অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের সুরে ‘বন্দেমাতরম’ পরিবেশন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে গানটি জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯০৫ সালের বেনারস কংগ্রেস অধিবেশনে সরলা দেবী চৌধুরাণীর কণ্ঠেও ‘বন্দেমাতরম’ পরিবেশিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
শুধু কংগ্রেসের ইতিহাস নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গেও ‘বন্দেমাতরম’-এর যোগসূত্রের কথা মনে করিয়েছেন সুমিত্র। চিঠিতে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানিয়েছেন, ১৯০৯ সালে রাজদ্রোহের বিচারের সময় আদালত প্রাঙ্গণে তাঁর অনুগামীদের কণ্ঠে এই গান শোনা গিয়েছিল। আবার ১৯৩৮ সালে হায়দরাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রেও ‘বন্দেমাতরম’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
সুমিত্রের বক্তব্য, ‘বন্দেমাতরম’ কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয় ঐক্য এবং অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। ফলে এই গানকে সম্মান জানানো মানে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকেই সম্মান জানানো।
চিঠিতে বঙ্কিমচন্দ্রের উত্তরসূরি হিসাবে নিজের আবেগের কথাও স্পষ্ট করেছেন সুমিত্র। তিনি লিখেছেন, আজকের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অনুভূতি যে গভীর ভাবে আহত হয়েছে, তা সোনিয়া গান্ধীকে জানানো তাঁর ‘নৈতিক কর্তব্য’ বলে মনে করেন। সেই সঙ্গে তাঁর পরিবারের একজন উত্তরসূরি হিসাবে তিনি কংগ্রেসের এই আচরণের জন্য দেশবাসীর কাছে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন জানিয়েছেন।
চিঠির শেষে সুমিত্রের সরাসরি আবেদন, সোনিয়া গান্ধী যেন বিষয়টি বিবেচনা করে ‘বন্দেমাতরম’-কে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে থাকা এই গানকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক না বাড়িয়ে তার ঐতিহাসিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন: বাড়ল গ্যাসের ই-কেওয়াইসির সময়সীমা, স্বস্তি গ্রাহকদের, কী জানাল কেন্দ্র?
স্বাধীনতা দিবসের আবহে ‘বন্দেমাতরম’ ঘিরে এই চিঠি নতুন করে রাজনৈতিক তরজা উসকে দিল। একদিকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবোধের প্রশ্ন তুলছে বিজেপি, অন্য দিকে বিজেপি বিধায়কের এই চিঠিতে বিতর্কটি আরও এক বার বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা গানটির ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কেন্দ্রে চলে এল।




