তাঁর দিল্লির বাসভবনে আগুন লাগার পর উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ পোড়া নোটের বান্ডিল। এই ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল গোটা দেশ। এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার (Justice Yashwant Varma) বিরুদ্ধে ওঠা সেই দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে বুধবার সংসদের দুই কক্ষেই জমা পড়ল তদন্ত কমিটির রিপোর্ট। প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে, বিচারপতি ভার্মার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই প্রমাণিত। রিপোর্টে সেটাই জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।
লোকসভা ও রাজ্যসভার সচিবালয় থেকে পৃথক ভাবে রিপোর্টটি টেবিলে রাখা হয়েছে। দু’টি খণ্ডে তৈরি এই রিপোর্টে রয়েছে সাক্ষীদের বয়ান এবং যাবতীয় নথিপত্র। প্রায় তিন মাস আগে, মে মাসেই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Om Birla) কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছিল তদন্তকারী তিন সদস্যের কমিটি।
ঘটনার সূত্রপাত
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ রাতে দিল্লিতে বিচারপতি ভার্মার সরকারি বাসভবনে আগুন লাগে। দমকলকর্মীরা আগুন নেভাতে গিয়ে স্টোররুমে বিপুল পরিমাণ পোড়া নগদ টাকা দেখতে পান। সেই মুহূর্তেই বিতর্কের শুরু। ঘটনার পরপরই বিচারপতি ভার্মাকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে সরিয়ে তাঁর মূল কর্মস্থল এলাহাবাদ হাইকোর্টে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার (Sanjiv Khanna) নির্দেশে গঠিত অভ্যন্তরীণ কমিটি জানিয়েছিল, ওই স্টোররুমের উপর বিচারপতি ভার্মা এবং তাঁর পরিবারের সরাসরি বা প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ ছিল। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দু’শোরও বেশি সাংসদ তাঁর ইমপিচমেন্ট (impeachment) বা অভিশংসনের দাবিতে সই করেন। তার পরেই আগস্টে লোকসভার স্পিকার একটি পৃথক তিন সদস্যের বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেন, যাতে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরবিন্দ কুমার, মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মণীন্দ্রমোহন শ্রীবাস্তব এবং কর্নাটক হাইকোর্টের প্রবীণ আইনজীবী বি ভি আচার্য।
তদন্তে কী উঠে এসেছে
তদন্ত কমিটি ৫৫ জনেরও বেশি সাক্ষীর বয়ান খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, বিচারপতি ভার্মার বিরুদ্ধে ওঠা তিনটি অভিযোগই প্রমাণিত। কমিটির বক্তব্য ছিল, স্টোররুমের নিয়ন্ত্রণ একান্তই ছিল বিচারপতি ও তাঁর পরিবারের হাতে। ঘটনার পরের দিন ভোরেই সেখান থেকে পোড়া টাকা সরিয়ে ফেলা হয় বলেও কমিটির পর্যবেক্ষণ। পুলিশে অভিযোগ না জানানো এবং ঊর্ধ্বতন বিচারবিভাগীয় কর্তাদের না জানানোকেও কমিটি স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে করেনি।
এর আগে বিচারপতি ভার্মা সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন করে এই তদন্ত প্রক্রিয়াকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। প্রতিটি আবেদনই খারিজ হয়ে যায়। লোকসভার স্পিকারের কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়ে তোলা প্রশ্নও সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণ করেনি।
এখন কী হবে
মামলায় সবচেয়ে বড় মোচড় হল, সম্প্রতি বিচারপতি ভার্মা নিজেই পদত্যাগ করেছেন। ফলে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন প্রক্রিয়া কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে। তবে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরে তা প্রকাশ্যে আনলেই একজন বিচারপতিকে পদত্যাগী বলে ধরা হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। এখনও পর্যন্ত আইন মন্ত্রক আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই পদত্যাগের বিজ্ঞপ্তি জারি করেনি।
তবু, সংসদে রিপোর্ট পেশ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, দেশের বিচারবিভাগীয় জবাবদিহি (judicial accountability) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে এটি একটি সংযোজন। বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া, তা প্রকাশ্যে আনা এবং সংসদীয় নজরদারি… এই গোটা কাঠামোটাই ফের আলোচনায় উঠে এসেছে এই ঘটনার হাত ধরে। এবং বিচারপতি ভার্মার মামলাটি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলেই মনে করছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল।




